ইরানে যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো চাপে পড়েছে। জ্বালানি সংকট এড়াতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে দেশগুলো।ভারতের উত্তরপ্রদেশের লখনৌ শহরের বাসিন্দা সালোনি বলেন, আজ আমার বিয়ে। আনন্দ করতে আত্মীয়রা বাড়িতে জড়ো হয়েছিলেন। কিন্তু এখন সবাই গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য লাইন দিয়েছেন।সংবাদ সংস্থা এএনআইকে সালোনি জানান, তিনি ভাবতেও পারেননি তার বিয়ের দিন বাবা-দাদাদের গিয়ে সিলিন্ডারের জন্য লাইন দিতে হবে।
ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে তামিলনাডু রাজ্যের ম্যারেজ হল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, মার্চ-এপ্রিল মাসে ওই রাজ্যে প্রায় ২০ হাজার বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। যার জন্য ২ লাখ গ্যাস সিলিন্ডার দরকার।কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে গ্যাসের সংকট। ফলে কীভাবে এত সংখ্যক গ্যাস সিলিন্ডার নিশ্চিত করা যাবে, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তারা।
শুধু এই দুই শহরে নয়, বাণিজ্যিক গ্যাস সরবরাহের জন্য সারা ভারতজুড়ে বহু দম্পতি তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা পেছাতে বাধ্য হয়েছেন বলে খবর মিলেছে।
যদিও পশ্চিমবঙ্গে এই সময়ে কয়েক সপ্তাহের জন্য বিয়ের মরশুমে বিরতি রয়েছে, তবে এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন বিয়ের মরশুমে কী হবে, সেই চিন্তা ইতিমধ্যেই গ্রাস করেছে ভাবী দম্পতি ও বিয়ের সঙ্গে যুক্ত পেশাদারদের।
পশ্চিমবঙ্গের এক ক্যাটারিং সংস্থার মালিক সৌরভ আদক জানিয়েছেন, ফাল্গুন মাসে বিবাহের শুভ তিথিগুলি পার হয়ে গেছে। বাংলা ক্যালেন্ডারের চৈত্র মাসে বিবাহ অনুষ্ঠানের চল নেই পশ্চিমবঙ্গে।
তবে সিলিন্ডার সাপ্লাইয়ে প্রভাব পড়েছে। বৈশাখ মাস পড়লেই ফের বিয়ের মরশুম শুরু হবে, তখন কী হবে জানা নেই, বলেন তিনি।
গ্যাসের বদলে কয়লা মজুত
ভারতজুড়েই মানুষের মনে তীব্র হচ্ছে জ্বালানি সংক্রান্ত আতঙ্ক। দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ক্ষেত্র থেকে উদ্বেগের ছবি সামনে আসছে। পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েছে।
আগামী ১০ দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিয়ের বুকিং বাতিল করতে হবে বলে মনে করছে ক্যাটারিং সংস্থাগুলো। দেশটির রেস্তোরাঁ ও ছোট দোকানগুলোতে সিলিন্ডার সংক্রান্ত কোনও নিষেধাজ্ঞা কাগজে-কলমে জারি না হলেও একাধিক দোকান-মালিক সিলিন্ডারের ঘাটতির কথা বলেছেন।
অনেকে কয়লা মজুত করা শুরু করেছেন। কলকাতার অফিসপাড়ায় ‘টিফিন এলাকা’ বলে পরিচিত ডেকার্স লেনে অবস্থিত খাবারের দোকানগুলি ইতিমধ্যেই কয়লার আগুনে রান্না করা শুরু করেছে।
কলকাতার বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে কড়াপাকের মিষ্টি তৈরি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন নামী মিষ্টির দোকান সীমিত সংখ্যক মিষ্টি তৈরি করছে। কিন্তু আগামী সপ্তাহে আদৌ যোগান স্বাভাবিক রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন কলকাতার মিষ্টি ব্যবসায়ীরা।
বিখ্যাত মিহিদানা, সন্দেশ তৈরিতে কাটছাঁট
শুধু কলকাতা নয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে। বর্ধমানের বিখ্যাত একটি মিষ্টির দোকানের মালিক জানিয়েছেন, তারা ওই অঞ্চলের বিখ্যাত মিহিদানা তৈরি আপাতত বন্ধ রেখেছেন।
চন্দননগরের জলভরা সন্দেশের আবিষ্কর্তা বলে বিখ্যাত শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মালিক শৈবাল মোদক বিবিসিকে জানিয়েছেন, গ্যাস ডিলাররা কবে দোকানে গ্যাস দিতে পারবেন, তা নিয়ে কোনও স্পষ্টআমরা আমাদের সাধারণ প্রোডাকশন এক চতুর্থাংশে নামিয়ে নিয়ে এসেছি। আগামী পাঁচ দিনের গ্যাস মজুত থাকলেও এর পর ডিজেলের স্টোভ ব্যবহার করতে হবে। আমরা পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নিয়ম মেনে ডিজেল ও কেরোসিন-চালিত স্টোভ ব্যবহার বন্ধ রেখেছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের আর কোনো উপায় নেই, বলছিলেন মোদক।
কী পদক্ষেপ সরকারের?
কেন্দ্র সরকারের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট করে জানানো হয়েছে, ঘরোয়া গ্যাসের সাপ্লাই ১০০ ভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
১২ মার্চ এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা। ওই সম্মেলন থেকে ভারতের পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা জানান, মানুষ যে ঘরোয়া গ্যাসের জন্য লাইন দিচ্ছেন তা মূলতঃ আতঙ্কের প্রতিফলন।
মানুষকে ‘প্যানিক বাইং’ থেকে বিরত থাকারও অনুরোধ জানান তিনি।
ভারতে জ্বালানি সংকট নেই- কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে এই দাবি আসা সত্বেও বাণিজ্যিক গ্যাস বিতরণে কড়াকড়ি করছে কেন্দ্র ও রাজ্য, উভয় সরকারই।
এমনকি ঘরোয়া গ্যাস সিলিন্ডার বুকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রথম বুকিংয়ের পরে দ্বিতীয় বুকিংয়ের অন্তর্বর্তী সময় ২১ দিন থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ দিন করা হয়েছে।
১২ মার্চের সাংবাদিক সম্মেলন থেকে সুজাতা শর্মা বলেন, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রগুলির জন্য হাসপাতাল ও স্কুলগুলিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু রাজ্যগুলির থেকে তাঁরা জানতে চেয়েছেন কোন কোন ক্ষেত্রগুলিতে সরবরাহ সুরক্ষিত করতে চায় রাজ্য সরকারগুলি।
রান্নার গ্যাসের সংকট মেটাতে ইতিমধ্যেই গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।
তিনি জানিয়েছেন, হাসপাতাল, স্কুল, আইসিডিএস সেন্টার, সংশোধনাগার ও বাড়িতে ব্যবহার্য গ্যাসকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়া হবে।
১৩ মার্চ (শুক্রবার) ফের একটি সাংবাদিক সম্মেলনে পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব জানিয়েছেন, এলপিজি গ্যাস হরমুজ প্রণালী হয়ে ভারতে আমদানি হয়, তবুও ভারতে কোথাও মজুতের ঘাটতি নেই।
গত কয়েক দিনে গড় বুকিং হয়েছে ৭৭ লাখের কাছাকাছি। যেখানে স্বাভাবিকভাবে ৫৫ লাখ বুকিং হয়ে থাকে, এই হঠাৎ বুকিং বৃদ্ধিকে মিস শর্মা ‘প্যানিক বাইং’-এর প্রতিফলন বলেই মনে করছেন। ইঙ্গিত দিতে পারছেন না।
















