স্কুলে ভর্তি আবার পরীক্ষাভিত্তিক হলে শিশুদের জীবনে এক নতুন চাপের অধ্যায় শুরু হতে পারে। ছোট বয়স থেকেই কঠোর প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে, যা তাদের স্বাভাবিক মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অভিভাবকরা পুনরায় কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হবেন; যা শুধু অর্থনৈতিক বোঝা বাড়াবে না, বরং শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, লটারি বাতিলের সঙ্গে পরীক্ষা ফেরানো হলে অতীতের অনিয়ম, প্রভাব আর বাণিজ্যের পুনরুত্থান হওয়ার সম্ভাবনা কম নয়। তাই এ পরিবর্তনকে বাস্তবায়ন করতে হবে সুপরিকল্পিত, স্বচ্ছ ও মানবিক পথে, যাতে শিশুর স্বপ্ন ও শিক্ষার মান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সরকার ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যমান লটারি পদ্ধতি বাতিল করা হবে। ফলে নতুন করে ভাবা হচ্ছে- কীভাবে নির্ধারিত হবে শিক্ষার্থীদের ভর্তি।
কিন্তু এ ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি সত্যিই শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে এক ধাপ, নাকি অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি?এক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর নামিদামি স্কুলগুলোয় ভর্তি মৌসুম মানেই ছিল এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা- যেখানে বই-খাতা নয়, কাজ করত সুপারিশ, প্রভাব আর অর্থের শক্তি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতীতে ভর্তি প্রক্রিয়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী একটি স্বার্থান্বেষী চক্র। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা- এ তিনের সমন্বয়েই অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত হতো শিক্ষার্থীর ভাগ্য।
তেজগাঁওয়ের এক অভিভাবক মো. রাশেদুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ছেলে ভালো পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু পরে শুনলাম টাকার বিনিময়ে অনেকেই সুযোগ পেয়েছে। তখন মনে হয়েছিল, মেধার কোনো মূল্যই নেই।’ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আরেকটি বড় বাস্তবতা। কোচিং বাণিজ্য। অনেক শিক্ষকই নিজ নিজ স্কুলের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে কোচিং চালাতেন। ফলে অভিভাবকদের ওপর তৈরি হতো এক অদৃশ্য চাপ ‘ভর্তি হতে চাইলে কোচিং দরকার।’
কমলাপুরের কলেজ ছাত্র সাফি (ছদ্মনাম) জানায়, ‘আমাকে একাধিক কোচিংয়ে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে শুনি, কিছু জায়গা থেকে প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে। তখন মনে হয়েছিল, পড়াশোনা নয়, অন্য কিছুই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস, এমনকি উত্তরপত্রে কারচুপির মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমন অভিযোগ ছিল মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সাবেক অধ্যক্ষ শাহান আরার বিরুদ্ধে। যে কারণে ভর্তির পরীক্ষা নিয়ে জনমনে অনাস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল।বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে চালু হয় লটারি পদ্ধতি। উদ্দেশ্য ছিল ভর্তি প্রক্রিয়ায় সমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। অনেক অভিভাবক মনে করেন, এটি অন্তত একটি নিরপেক্ষ সুযোগ তৈরি করেছিল। রামপুরার নাসরিন আক্তার নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘লটারির কারণে আমরা অন্তত আশা করতে পারতাম, আগের মতো টাকার খেলা ছিল না। এ বছর সন্তানকে আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি করাতে পেরেছি।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন, এ পদ্ধতিতে অনিয়ম অনেকাংশে কমেছিল। একই সঙ্গে কোচিংনির্ভরতা ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেনও হ্রাস পায়।
কেন ফিরছে পরীক্ষা? তবে লটারি পদ্ধতির বিরোধিতাও ছিল। বিশেষ করে কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষের মতে, এতে মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাই করা সম্ভব হচ্ছে না। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সাবেক এক ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য বলেন, ‘লটারিতে আমাদের স্কুলের ফলে প্রভাব পড়েছে। আমরা মেধাভিত্তিক ভর্তি চাই।’
সরকারও এখন সেই দিকেই ঝুঁকছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লটারির পরিবর্তে ‘মেধা যাচাই বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’ চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন গতকাল সোমবার নিজ মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমরা লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি- যাতে সবাই প্রস্তুতি নিতে পারে।
নতুন শঙ্কা ‘ভর্তিযুদ্ধ’ ফিরে আসছে? তবে এ সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরে এলে আবার শুরু হবে ‘ভর্তিযুদ্ধ’। শিশুদের ওপর বাড়বে মানসিক চাপ, কম বয়সেই পড়তে হবে কঠোর প্রতিযোগিতার মুখে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রথম শ্রেণির মতো ছোট পর্যায়ে এ চাপ শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগ কোচিং বাণিজ্যের পুনরুত্থান। ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করার তাগিদে অভিভাবকরা আবার কোচিংনির্ভর হয়ে পড়তে পারেন। এতে শুধু অর্থনৈতিক চাপই বাড়বে না, বরং শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে অসমতা আরও গভীর হতে পারে।শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সরাসরি পরীক্ষা নয়, বরং বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনা করা উচিত।
এ প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, লটারি তুলে দেওয়ার আগে মাঠের বাস্তবতা দেখা দরকার। কারণ গ্রামে তো লটারি নেই- এটি মূলত শহরের নামি স্কুলগুলোর জন্য। তিনি ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ পদ্ধতির ওপর জোর দেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকার স্কুলে অগ্রাধিকার পাবে। এতে যাতায়াত ব্যয় কমবে, অভিভাবকদের আর্থিক চাপও হ্রাস পাবে।বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে, মূল সমস্যা পদ্ধতিতে নয়, বাস্তবায়নে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘পরীক্ষা চালু করতে হলে আগে নিশ্চিত করতে হবে- এটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হবে। না হলে ভর্তি পরীক্ষা আবার বাণিজ্যের হাতিয়ার হয়ে উঠবে।’ তিনি বলেন, লটারি পদ্ধতি অন্তত একটি নিরপেক্ষ সুযোগ তৈরি করেছিল। আবার পরীক্ষাভিত্তিক পদ্ধতি মেধা যাচাইয়ের সুযোগ দিলেও তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, স্কুল ভর্তি শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম ধাপ। তাই এ সিদ্ধান্ত হতে হবে সুপরিকল্পিত, স্বচ্ছ এবং মানবিক। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, মেধা ও সমতার মধ্যে সুষম সমন্বয় গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নচেৎ, নতুন নীতির আড়ালে পুরনো অন্ধকারই ফিরে আসবে। আর সেই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে হাজারো শিশুর স্বপ্ন।
















