ক্রমাগত অবহেলা আর সরকারের যথাযথ মনোযোগের অভাবে ভীষণ দুর্দিনে পড়েছে বীমা খাত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) দুর্বলতায় বিকাশের পথও পায়নি এ খাত। অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।
অর্থনীতিকদের ভাষ্য, দেশের চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বীমা কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই খাতে পেশাদারি ও জনসাধারণের আস্থার অভাব আছে। বীমা দাবি নিষ্পত্তির সংখ্যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম হওয়ায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান তারল্য সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা এখন একত্রীকরণ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করার মতো কঠোর উদ্যোগের আহ্বান জানাচ্ছেন। এসব গোষ্ঠী প্রায়ই রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখিয়ে অর্থ উপার্জনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়া রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী না করে এতগুলো বীমা প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন দেওয়ায় সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না আইডিআরএ।
জানা গেছে, জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর মোট প্রিমিয়াম আয় কমেছে। কমেছে বীমা দাবি পরিশোধের পরিমাণও। অথচ আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে জীবন বীমা খাতের বিনিয়োগ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জীবন তহবিলের পরিমাণ ও মোট সম্পদ। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশি মিলিয়ে বর্তমানে ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানি রয়েছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠান মোট প্রিমিয়াম আয় করেছে ১১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা আগের বছর ২০২৩ সালে ছিল ১১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে জীবন বীমা খাতে প্রিমিয়াম আয় কমেছে ১২১ কোটি টাকা।জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বীমা দাবি পরিশোধের সক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তাদের জীবন তহবিলের ওপর। বিআইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জীবন বীমা খাতের জীবন তহবিল ছিল ৩১ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ২৩২ কোটি টাকা।
তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে নন-লাইফ বা সাধারণ বীমা খাতে। ২০২৪ সালে ৪৬টি নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানের মোট প্রিমিয়াম আয় আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালে এ খাতের মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৪ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে নন-লাইফ বীমা খাতে বিনিয়োগ কমেছে ১৫৮ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে এ খাতে বিনিয়োগ ছিল ৫ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে কমে ৫ হাজার ৬১৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
বীমা সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের কয়েক কোম্পানি পুরো বীমা খাতের পরিবেশ নষ্ট করছে। এসব কোম্পানি সঠিকভাবে গ্রাহকের দাবির টাকা পরিশোধ করছে না। ফলে বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। তারা ঠিকমতো গ্রাহকদের দাবির টাকা পরিশোধ না করায় পুরো সেক্টরে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। যতদিন এসব কোম্পানি গ্রাহকের দাবির টাকা পরিশোধ করতে পারবে না, ততদিন তাদের নতুন পলিসি ইস্যু করতে দেওয়া উচিত হবে না।
আইডিআরএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বিক জীবন বীমা খাতে ৬৫ শতাংশ বীমা দাবি বকেয়া থাকার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে সাতটি কোম্পানি। এর মধ্যে রয়েছে- ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রোগ্রেসিভ লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, বায়রা লাইফ এবং সান লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এই কোম্পানিগুলোতে প্রায় সব বীমা দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে। এই সাত কোম্পানিতে বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ ৩ হাজার ৫৭১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ জীবন বীমা খাতের যে বীমা দাবি বকেয়া আছে তার ৯০ শতাংশের বেশি এই সাত কোম্পানির।
তথ্যে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বীমা দাবি বকেয়া রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে। কোম্পানিটিতে ২ হাজার ৮১৫ কোটি ১ লাখ টাকার বীমা দাবি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে কোম্পানিটি। বিপরীতে বীমা দাবি বকেয়া রয়েছে ৩৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। দাবি পরিশোধ না করার হার ৯৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের নন-লাইফ
বীমা খাতে উত্থাপিত দাবির ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ পরিশোধ করেছে কোম্পানিগুলো। ফলে ৯১ দশমিক ৭০ শতাংশ বীমা দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। আইডিআরএর প্রকাশিত ২০২৫ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ আমাদের সময়কে বলেন, আইডিআরএ আর্থিকভাবে স্বাধীন নয় এবং সেখানে পর্যাপ্ত পেশাদার জনবলও নেই। সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ থাকলে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও প্রয়োজনের তুলনায় দেশে বীমা কোম্পানির সংখ্যা বেশি। অনেক কোম্পানি যথাসময়ে দাবি পরিশোধ করছে না। ফলে প্রতারণার অভিযোগ বাড়ছে এবং মানুষের আস্থা কমছে। এ পরিস্থিতিতে আইডিআরএকে শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই।
















