ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে শুটার ফয়সাল, তার পরিবার এবং কথিত বান্ধবীকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে।
এই হত্যাকাণ্ড কোনো তাৎক্ষণিক বা একক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত অপারেশন, যেখানে পরিবারের একাধিক সদস্যসহ একটি সংগঠিত গ্রুপ সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল।
র্যাব ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হত্যাচেষ্টা বাস্তবায়নে অন্তত ২০ জনের একটি গ্রুপ বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে। কেউ অর্থের জোগান দিয়েছে, কেউ অস্ত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছে, আবার কেউ শুটারকে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার রুট, যানবাহন ও সীমান্ত পার হওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে।
তদন্তে জানা গেছে, শুটার ফয়সালের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া সই করা একাধিক চেক এই হত্যাকাণ্ডের অর্থনৈতিক দিকের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব চেক থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওসমান হাদীকে সরানোর জন্য বড় অঙ্কের অর্থ সরবরাহ করা হয়েছিল। অর্থের উৎস ও পেছনের নেপথ্য শক্তি চিহ্নিত করতে তদন্ত আরও জোরদার করা হয়েছে।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো,হামলার পর শুটার ফয়সালের পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার বাবা হুমায়ুন কবির সরাসরি ভূমিকা রাখেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। র্যাবের দাবি অনুযায়ী, গুলি চালানোর পর ফয়সালের বাবা নিজে উপস্থিত থেকে মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট পরিবর্তন করে দেন এবং ছেলেকে নিরাপদে পালানোর জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করেন। এ ঘটনায় ফয়সালের বাবা হুমায়ুন কবির ও মা মোসাম্মাৎ হাসি বেগমকে র্যাব-৩ গ্রেফতার করেছে।
অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনাও তদন্তকে আরও জোরালো করেছে। র্যাব জানায়, নরসিংদীর একটি বিল এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ৫২ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে, যা হামলার প্রস্তুতির মাত্রা স্পষ্ট করে।
পাশাপাশি আগারগাঁওয়ের কর্নেল গলিতে ফয়সালের বোনের বাসার নিচ থেকে হত্যাচেষ্টায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের দুটি ম্যাগাজিন ও ১১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, এগুলো বোনের বাসা থেকেই নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতের ঘটনাও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হামলার আগের রাতে ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর সাভারের গ্রিন জোন রিসোর্টের ২০৪ নম্বর কক্ষে অবস্থান করেন।
সেখানে ফয়সালের কথিত বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমাও উপস্থিত ছিলেন। ওই রাতে ফয়সাল তার বান্ধবীকে বলেন, কাল এমন কিছু হবে, সারা দেশ কাঁপবে। এই বক্তব্য হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান থাকার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
পরদিন শুক্রবার সকাল ৮টা ২৭ মিনিটে তারা একসঙ্গে রিসোর্ট ত্যাগ করেন। রওনা হওয়ার সময় ফয়সাল তার বান্ধবী মারিয়াকে তিন হাজার টাকা দেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। ওসমান হাদীর ওপর হামলার বিষয়টি মারিয়া আগে থেকেই জানতেন কি না, কিংবা তিনি কোনোভাবে এতে সহায়তা করেছেন কি না—সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা, অর্থের উৎস এবং দেশীয় কিংবা সীমান্ত-সংযুক্ত কোনো নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা যাবে না বলেও তারা উল্লেখ করেছে।















