দিমিত্রি রাশিয়ান শান্তিরক্ষী ও স্থানীয় নারী কামাতে বিবিচের ছেলে। কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন এমওএনইউএসসিও-র এক বেদনাদায়ক স্মৃতি সে। ১৯৯৯ সাল থেকে শান্তিরক্ষী মোতায়েনের পর থেকে রয়েছে যৌন শোষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তার মা কামাতে বলেন, ‘ওর কোঁকড়ানো চুল আর হালকা গায়ের রঙের কারণে বাকি শিশুরা প্রায়ই ওকে বিরক্ত করে। সেই লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে চায় না বলেই ঘরেই লুকিয়ে থাকে।’
কামাতে তার বিছানার নিচ থেকে ধুলোমাখা এক বাক্স বের করে আনলেন। সেখানেই রয়েছে তার অতীতের স্মৃতি—একটি পুরনো সামরিক টুপি ও ইউরি নামের সেই শান্তিরক্ষীর সঙ্গে তোলা একটি ছবি, যিনি দিমিত্রির বাবা।
স্মৃতিচারণ করে কামাতে বলেন, ‘ও অন্যদের মতো ছিল না। খুব ভালো ব্যবহার করতো, ভালোবাসতো। সেই তিন মাস ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে শান্তিময় সময়।’
ইউরি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী ছিলেন।
জাতিসংঘের ২০০৫ সালের একটি প্রস্তাবে জাতিসংঘ কর্মীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সম্পর্ককে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ বলে বিবেচনা করা হয়, এমনকি তা সম্মতিতেই হয়ে থাকলেও।
এমওএনইউএসসিও মুখপাত্র জানান, ‘আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে ২০১২ সালে নিয়োজিত রাশিয়ান শান্তিরক্ষীদের বিষয়ে তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।
সহজ শিকার নারীরা
পূর্ব কঙ্গোতে দশকের পর দশক ধরে চলছে সশস্ত্র লড়াই। এম-টুয়েন্টি থ্রি বিদ্রোহীদের হামলায় গোমা শহরের পতনে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৭ হাজার মানুষ, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৮০ লাখেরও বেশি।
এই দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নারীরা পড়েছেন ভয়াবহ ঝুঁকিতে।
মারিয়া মাসিকা (ছদ্মনাম), তার ৮ বছর বয়সী মেয়ে কুইনকে দেখতে এসেছেন গোমায়। মেয়েটি নিরাপত্তার কারণে থাকে নানির কাছে। ১৭ বছর বয়সে মিনুগি ঘাঁটির কাছে নিযুক্ত এক দক্ষিণ আফ্রিকান শান্তিরক্ষীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন মাসিকা।
মাসিকা বলেন, ‘সে জানতো আমি প্রাপ্তবয়স্ক না । ঘাঁটির পাশে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতো।’
কুইনের জন্মের পর সেই শান্তিরক্ষী হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যায়। মেয়েকে বড় করতে এখন মারিয়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পতিতাবৃত্তি করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার সেনাবাহিনী জানায়, যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তারা গুরুত্বসহকারে নেয়। কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে বিচার হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
কঙ্গোর একটি শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের তথ্যে জানা যায়, সেখানে অন্তত পাঁচ শিশু রয়েছে যারা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের সন্তান। তাদের মায়েরা শোষণের শিকার হয়ে সন্তান ফেলে চলে গেছেন।
কেন্দ্রের পরিচালক নেলি কাইয়া, ‘আমরা প্রায় ২০০ নারী ও কিশোরীকে সহায়তা করি, যাদের অনেকে এখন বেঁচে থাকার জন্য দেহ ব্যবসায় নেমেছেন।’
বিচারের চেয়ে অপমান বেশি
নারী অধিকার সংগঠন সোফেপাডির জাতীয় সমন্বয়ক স্যান্ড্রিন লুসামাবা বলেন, ‘জাতিসংঘ সরাসরি অভিযুক্তদের বিচার করতে পারে না। আর অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রও নিজ সৈন্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না।’
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে শান্তিরক্ষা ও রাজনৈতিক মিশনে যৌন শোষণের ১০০টি অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ৬৬টি কঙ্গো মিশনের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় ১৪৩ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ২৮ জন ছিল শিশু।
নামে ‘জিরো টলারেন্স’, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন
এমওএনইউএসসিও মুখপাত্র জানান, ‘যেসব অভিযোগের প্রমাণ মেলে, অভিযুক্তদের জাতিসংঘ সিস্টেম থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।’
তারা ভিকটিমদের জন্য প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সহায়তার কথাও বলেন। কিন্তু বাস্তবে কামাতে বা মারিয়া কেউই এই সহায়তা পাননি। অনেকে এতটাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন যে ন্যায়বিচারের জন্য এগিয়ে আসার সাহস পান না।
















