প্রায় দুই বছর ধরে গাজায় চলা যুদ্ধ থামাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা সোমবার সমর্থন করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ পরিকল্পনা ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের সঙ্গেও ভাগাভাগি করা হয়েছে।
এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘আমি আপনার পরিকল্পনাকে সমর্থন করছি, যা আমাদের যুদ্ধ-লক্ষ্য পূরণ করবে।
এটি আমাদের সব জিম্মিকে ফিরিয়ে আনবে, হামাসের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেবে, তাদের রাজনৈতিক শাসন শেষ করবে এবং নিশ্চিত করবে যে গাজা আর কখনো ইসরায়েলের জন্য হুমকি হবে না।’
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তরিক ও দৃঢ় প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায় এবং তার শান্তির পথ খুঁজে পাওয়ার সক্ষমতায় আস্থা প্রকাশ করে।’
ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ বলেছেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিকভাবে হারানো সুযোগ… এবং আমার ধারণা, এটি কান্নায় গড়াবে। আমাদের সন্তানদের আবার গাজায় লড়াই করতে হবে।
আমরা পরামর্শ করব, বিবেচনা করব এবং ঈশ্বর ইচ্ছুক হলে সিদ্ধান্ত নেব। তবে গতকাল থেকে যে উল্লাস চলছে তা সম্পূর্ণ হাস্যকর।’
গাজাভিত্তিক ইসলামিক জিহাদ জিয়াদ আল-নাখালার প্রধান বলেছেন, ‘ইসরায়েল যা যুদ্ধে অর্জন করতে পারেনি, তা যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে চাপিয়ে দিতে চাইছে। তাই আমরা মার্কিন-ইসরায়েলি এই ঘোষণাকে অঞ্চলকে উত্তপ্ত করে তোলার রেসিপি মনে করি।
’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কাল্লাস বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা একটি স্থায়ী শান্তির সুযোগ। এটি যুদ্ধ শেষ করার সর্বোত্তম তাৎক্ষণিক সুযোগ।
ইইউ পরিকল্পনাটি সফল করতে প্রস্তুত। ইসরায়েল ইতিমধ্যেই এতে সই করেছে। এখন হামাসকে দেরি না করে মেনে নিতে হবে এবং জিম্মিদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
’
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, মিসর, জর্দান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ বিবৃতি বলেছেন, ‘মন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে ইতিবাচক ও গঠনমূলকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রস্তুতি ঘোষণা করছেন, যাতে একটি চুক্তি চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন হয় এবং এ অঞ্চলের জনগণের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়।
তারা পুনরায় প্রতিশ্রুতি দেন, তারা একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবেন। যার মাধ্যমে গাজায় যথেষ্ট মানবিক সহায়তা প্রবেশে কোনো বাধা না থাকে, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ না করা হয়, জিম্মিরা মুক্তি পায়, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, ইসরায়েল সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে, গাজা পুনর্গঠিত হয় এবং দুই রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে ন্যায়সংগত শান্তির পথ তৈরি হয়, যেখানে গাজা সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম তীরের সঙ্গে একীভূত হয়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন করবে।’দ
জাতিসংঘের জেনেভা দপ্তরের মুখপাত্র আলেসান্দ্রা ভেলুচ্চি বলেছেন, ‘আমরা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে শান্তি প্রচেষ্টা নিয়ে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা সব ধরনের মধ্যস্থতাকে স্বাগত জানাই। এবং অবশ্যই আমরা যে কোনো শান্তি পরিকল্পনাকে সহায়তা করতে প্রস্তুত, যার মধ্যে মানবিক সহায়তা প্রদানের বিষয়ও রয়েছে।’
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, ‘গাজায় রক্তপাত বন্ধ ও যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টা ও নেতৃত্বকে আমি সাধুবাদ জানাই। তুরস্ক ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে থাকবে।’
ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘চলমান ট্র্যাজেডি থামাতে ট্রাম্পের যেকোনো প্রচেষ্টাকে রাশিয়া সবসময়ই সমর্থন ও স্বাগত জানায়। আমরা চাই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হোক এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলিকে শান্তিপূর্ণ উপসংহারে পৌঁছাতে সাহায্য করুক।’
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেৎস বলেছেন, ‘আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থাপিত গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাই। এ পরিকল্পনাই যুদ্ধ শেষ করার সর্বোত্তম পথ। ইসরায়েল এ পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন হামাসকে সম্মতি দিতে হবে এবং শান্তির পথ উন্মুক্ত করতে হবে।’
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ এক্সে বলেন, ‘গাজায় যুদ্ধ থামাতে ও সব জিম্মিকে মুক্ত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিকে আমি স্বাগত জানাই। আমি আশা করি, ইসরায়েল এই ভিত্তিতে দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত হবে। হামাসের এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই—তাদের অবিলম্বে সব জিম্মি মুক্ত করতে হবে এবং এ পরিকল্পনা মেনে চলতে হবে। এই ধাপগুলোই অঞ্চলে দুই রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে স্থায়ী শান্তির জন্য গভীর আলোচনার পথ তৈরি করবে, যা ফ্রান্স ও সৌদি আরবের উদ্যোগে জাতিসংঘের ১৪২ সদস্য রাষ্ট্র অনুমোদন করেছে।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ‘গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ গভীরভাবে স্বাগত জানাই এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসা করি। আমরা তার প্রচেষ্টাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি—যুদ্ধ থামানো, জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজার জনগণের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এখনই ঘটতে হবে।’
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, ‘গাজা সংকটে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনাকে স্পেন স্বাগত জানায়। আমাদের এই ভয়াবহ কষ্টের অবসান ঘটাতে হবে। এখনই সহিংসতা থামাতে হবে, সব জিম্মিকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে এবং মানবিক সাহায্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে দিতে হবে। দুই রাষ্ট্র সমাধানই একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান—যেখানে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন পাশাপাশি শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করবে।’
















