বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। কেবল একটি জানাজা কীভাবে জনসমুদ্রে রূপ নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বার্তায় পরিণত হতে পারে, তার সাক্ষী হলো রাজধানী ঢাকা। জুমার রাতে শাহাদাত বরণ করা তরুণ দেশপ্রেমিক শরীফ ওসমান বিন হাদির শেষ বিদায় অনুষ্ঠান রূপ নিয়েছিল জাতীয় সংহতির এক বিশাল মঞ্চে। দেশের ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে এক নতুন ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অকুতোভয় এই বীর সৈনিক।
দেশবিরোধী সন্ত্রাসীদের নৃশংস গুলিতে বাংলাদেশের আকাশে এক উজ্জ্বল ধুমকেতুর মতো উদয় হয়ে দেশপ্রেমের অগ্নিমন্ত্র ছড়িয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে চির বিদায় নিয়ে চলে গেলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাহসী সংগঠক ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র। শনিবার (২০ ডিসেম্বর) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ইতিহাসখ্যাত এক জানাজার মধ্য দিয়ে চিরবিদায় জানানো হয় এই মৃত্যুঞ্জয়ী বীরকে। সংসদ ভবনের আশপাশের এলাকায় মানুষের এতই ভিড় ছিল যে, কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল বিদায়
ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার সন্তান ওসমান হাদি রাজধানীর বিজয়নগরে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হয়ে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন। তার জানাজায় খামারবাড়ি থেকে আসাদ গেট পর্যন্ত পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। মানুষের এই ঢল দেখে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজার পর বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের এত স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক অংশগ্রহণ আর কখনও দেখা যায়নি।
জানাজা শেষে উপস্থিত জনতা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একবাক্যে ঘোষণা করেছেন, হাদির অসমাপ্ত বিপ্লব ও আদর্শকে এগিয়ে নেওয়াই হবে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ প্রতিশোধ। উপস্থিত জনতা আরও স্লোগান দেন—এক হাদিকে স্তব্ধ করে দিলেও লক্ষ হাদি আজ বাংলার ঘরে ঘরে জন্ম নিয়েছে। হাদির রক্তে ভেজা এই পথ ধরেই বাংলাদেশ একদিন সম্পূর্ণ আধিপত্যমুক্ত ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
জানাজার আগে যখন হাদির ভাই বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত লাখো মানুষের কান্নায় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়। যে মানুষটির হৃদয় অনেক কঠিন, তিনিও এসময় অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। কোনো রাজনৈতিক প্রলোভন বা অর্থ ছাড়াই কেবল ভালোবাসার টানে সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছিল তাদের প্রিয় ‘ওসমান’কে একনজর দেখতে। উপস্থিত এক বৃদ্ধ আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘‘তুমি বাতাসা খাইয়ে এমপি হতে চেয়েছিলে, আজ তোমার জন্য দোয়া করতে কোটি মানুষের বাতাসাও খরচ করতে হলো না।’’
আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কঠিন বার্তা
এই জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, বরং এটি ছিল এক জোরালো রাজনৈতিক প্রতিবাদ। বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, ওসমান হাদির জানাজায় যে জনস্রোত, তা প্রমাণ করে এদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং ফালতু ফ্রেমিংয়ের কবর রচিত হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা বলছেন, হাদি তার জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ দেখিয়ে গেছেন। যারা তথাকথিত ‘সংস্কৃতি’ আর ‘পুরানো বয়ান’ দিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল, এই জনসমুদ্র তাদের জন্য এক চরম বার্তা। মানুষ এখন আর ইনিয়ে বিনিয়ে বলা থিসিস চায় না, বরং উন্নত শির এক আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ চায়।
নেটাগরিকরা বলছেন, হাদির এই ‘রাজকীয় বিদায়’ বিপ্লবীদের মনে নতুন করে সাহস জুগিয়েছে। প্রতিটি বিপ্লবী এখন হাদির মতো দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত। দেশপ্রেমিক জনতা তাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যারা হাদির খুনি কিংবা নেপথ্য কুশলী, তারা গর্তে লুকিয়ে থাকলেও ছাড় পাবে না। হাদির হত্যার বিচার ও ইনসাফ কায়েমের মাধ্যমে দেশ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা হবে।
আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একবিংশ শতাব্দীর ‘বিদ্রোহী’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ছাত্রনেতারা হাদিকে তুলনা করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা যেমন ব্রিটিশ রাজ কাঁপিয়ে দিয়েছিল, হাদির কণ্ঠে সেই কবিতার আবৃত্তি তেমনি ভারতীয় আধিপত্য বাদ ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসা এই তরুণ নেতা জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তিনি দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি এবং বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু করেছিলেন, তা আজ কোটি তরুণের অনুপ্রেরণা।
এক সার্থক জীবনের সমাপ্তি
ওসমান হাদির এই প্রস্থানকে অনেকে ‘ঈর্ষণীয় মৃত্যু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। জুমার দিনে গুলিবিদ্ধ হয়ে জুমার রাতেই না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এবং দেশের প্রতিটি মসজিদের কোটি কোটি মানুষের দোয়া পাওয়া—এমন সৌভাগ্য খুব কম মানুষের কপালে জোটে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশপন্থার রাজনীতি যে এদেশের মানুষের মজ্জাগত, ওসমান হাদির জানাজা তা আবারও প্রমাণ করল। এক হাদিকে সরিয়ে দিয়ে যারা দমাতে চেয়েছিল, তারা আসলে লাখো হাদির জন্মের পথ প্রশস্ত করে দিল। বাংলাদেশ আজ হাদিকে বিদায় জানায়নি, বরং তার আদর্শকে বরণ করে নিয়েছে ইনসাফের দেশ গড়ার শপথ নিয়ে।
জানাজায় উপস্থিত হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘‘হাদি, তুমি আমাদের বুকের মধ্যে আছো। আমরা তোমাকে বিদায় দিতে এখানে আসিনি। বাংলাদেশ যতদিন টিকে থাকবে, তুমি আমাদের মাঝে থাকবে। হাদি যা বলে গেছেন, সেই স্বপ্ন ও ওয়াদা পূরণ করাই হবে বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।’’
বাংলার জমিনে খুনিদের বিচার চান বড় ভাই
হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘‘আজ আট দিন হয়ে গেল, প্রকাশ্য দিবালোকে জুমার নামাজের পর আমার ভাইকে গুলি করা হলো, অথচ খুনিরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আমি এই বাংলার জমিনেই আমার ভাই হত্যার বিচার দেখতে চাই।’’ হাদির মাত্র আট মাস বয়সী সন্তানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাদি সব সময় শাহাদাতের তামান্না করত, আল্লাহ তাকে সেই মর্যাদা দান করেছেন।
















