ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশকের টানাপড়েন, দমন-পীড়ন, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং জুলাই আন্দোলনের পর ভোটাররা এবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেনÑ পরিবর্তন চাই, তবে সেই পরিবর্তন যেন গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট না করে। ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোটার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে বিশ্লেষকরা সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন। ফলও অনেকাংশে ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যইÑ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
তবে এমন বিজয় উল্লাসের মধ্যেই উচ্চারিত হচ্ছে সতর্কতার সুরও। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রায়ই ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিকে দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে দমন-পীড়নের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বিএনপি ও জামায়াতের জন্য সহানুভূতির পুঁজি তৈরি করেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বের পুনর্গঠন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং নতুন প্রজন্মের ভোটারদের প্রত্যাশাÑ সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বাস্তবতার নানা সমীকরণ।
কিন্তু এবারের সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব আশঙ্কাজনক হারে কমে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো তাদের মনোনয়নে নারী রাখেনি, যা আগামীতে নারীদের রাজনীতি কঠিন করে তুলতে পারে।ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোটার। সরকার গঠনের জন্য ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়ে এগিয়ে আছে বিএনপি। দলগতভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৮টি আসন নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখা যাবে জামায়াতে ইসলামীকে। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন শেষে গতকাল শুক্রবার বিকালে আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
এদিকে চট্টগ্রামের দুই আসনের ফল আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। তাই ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৭ আসনের বেসরকারি ফল প্রকাশ করেছে ইসি। বেসরকারি ফলে বিএনপি পেয়েছে ২০৯টি আর জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ হলেও গণভোটে তা ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। এর মাধ্যমে সংশোধন ও পরিবর্তনের পক্ষে জনগণ স্পষ্ট মত দিয়েছে।
দলভিত্তিক আসন চিত্র তুলে ধরে ইসি সচিব জানান, বিএনপি ২০৯টি, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি, এনসিপি ৬টি, খেলাফত মজলিস ২টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়লাভ করেছেন।
গেজেট প্রকাশ প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে চূড়ান্ত ফলাফলের হার্ডকপি না পাওয়া পর্যন্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে না। বার্তাশিটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা শেষে একসঙ্গে ডিজিটাল আদেশে গেজেট প্রকাশ করা হবে। চূড়ান্ত শিট হাতে পেলেই গেজেট জারি হবে।
এদিকে, সুষ্ঠু পরিবেশে ভোটারদের নিরঙ্কুশ সমর্থনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি যেন ক্ষমতার এককেন্দ্রিতায় না যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে বলেছেন তারা। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী দলগুলোর অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। নানা কারণেই তারা একরোখা হয়ে ওঠে। তবে জুলাই আন্দোলনের বার্তা মাথায় রেখে পথ চললে, কোনো দল আর স্বৈরাচার হতে চাইবে না। নির্বাচনের ফল প্রত্যাশিত হয়েছে। নতুন কোনো চমক নেই। তবে নতুন সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচনের ফলে কোনো সারপ্রাইজিং কিছু দেখছি না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কোনো দল পরপর দুইবার ক্ষমতায় যেতে পারেনি। বিগত ১৭ বছর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং দলটির ওপর চলা অত্যাচার, হত্যা, গুম, খুন, দমন-পীড়ন করে দলটি দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর নির্যাতনের ফলে দলটির প্রতি জনগণের একটা অনুকম্পা বা সমর্থন বেড়েছে। তাই ফল বিএনপির জন্য স্বাভাবিক ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছিল, জুলাই আন্দোলনের সময় দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল; গণতান্ত্রিক দেশে মানুষ এটা ভালো চোখে দেখেনি। এজন্য জামায়াতের প্রতি মানুষের সমর্থন বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে যে ফল দেখছি; এটা অস্বাভাবিক কিছু মনে হচ্ছে না। অন্যদিকে জামায়াতকেও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে চলতে হয়েছে, তাই দেশের মানুষের ভালোবাসা দল দুটির প্রতি বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। এই ফল অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটেনি।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে বলেই মনে করেন ড. আব্দুল আলীম। তিনি বলেন, দলটি এর আগেও দুই-তৃতীয়াংশ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। তখন কিন্তু তারা সংবিধানে খুব বেশি হাত দেয়নি। কাজেই তারা একরোখা হবে, এটা মনে করি না। তাছাড়া জুলাই আন্দোলনের যে বার্তা, সেটা মনে রাখলে কেউ অতীতে ফিরে যেতে চাইবে না। তাছাড়া এবার সংসদে একটা শক্তিশালী বিরোধী দল পাবে। জামায়াত একটা সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। তাদের যারা এমপি হয়েছেন, সবাই পড়াশোনা করেন। তাছাড়া এনসিপির যারা সংসদে গেছেন, তারাও সরকারি দলকে ছাড় দেবে না। ক৬াজেই এবারের সংসদ হবে অনেক প্রাণবন্ত।
দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় যাচ্ছে বিএনপি। দলটির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক রাজনৈতিক সম্পর্ক, সবকিছু নতুন করে সাজাতে হবে। এত চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগবিহীন রাজনীতির মাঠে ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে জামায়াত। দক্ষিণপন্থার রাজনীতির এই উত্থান সামনের রাজনীতির জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া এবারের নির্বাচনে আশঙ্কাজনক হারে নারী নেতৃত্ব কমে যাওয়ার ফলে সামনের রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে যাবে, তা নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচন ভালো হয়েছে। ৫ শতাংশ ত্রুটি থাকলেও সেটা খুব অস্বাভাবিক না। প্রত্যাশা অনুযায়ী বিএনপি জেতার কথা, বিএনপিই জিতেছে। মুশকিলটা হলো, দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। বিগত ২০ বছরে নির্বাচনের ফলের যে ধারা, সেটা বিএনপির জন্য সুখকর, কিন্তু জাতির জন্য সুখকর তখনই হবে, যদি কেউ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে স্বৈরাচারী হয়ে না ওঠে। দলটির নির্বাচনে জেতার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তারেক রহমানের ভালো নেতৃত্বের কারণে তাদের এই বিজয়। তার বর্তমান সময়ের কথা-বার্তা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। তিনি দেশে ফেরার পর দলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির যে ন্যারেটিভ ছিল, সেটা চাপা পড়ে গেছে। তিনি বলেন, এই ফল তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং যেহেতু আওয়ামী লীগ মাঠে নেই, তাই দলটির জন্য এ বিজয় সহজ হয়েছে। জামায়াত শক্তিশালী হলেও কাঠামাগতভাবে শক্ত হয়নি।
দলগুলোর কর্মকাণ্ডে রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ ঠিক হবে। জামায়াত বিরোধী দলে থেকেও যদি ভালো কাজ করে, তাহলে তারা টিকে থাকবে। আর বিএনপি যদি ক্ষমতায় থেকে স্বৈরাচারী আচরণ করে, তাহলে বিএনপির জনপ্রিয়তায় ধস নামবে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যদি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে, তাহলে সামনের দিনগুলো সহজ হবে না। নারী প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে খুব বেশি একটা এগুলো না।
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। তবে একটি দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া ক্ষমতার ভারসাম্য কঠিন হয়ে যায়। এজন্য দলগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে একটি দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া গণতন্ত্রের জন্য অভিশাপ। অতীতের রেকর্ড ভালো নয়। এখন দলগুলো তাদের প্রতিজ্ঞা কতটুকু রাখে, সেটাই দেখার বিষয়।
















