ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে হিসাব-নিকাশ থামেনি। আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নির্বাচনে অংশগ্রহণ, প্রাপ্ত আসন, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও দলত্যাগ- সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নতুন কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত জুলাই আন্দোলনে সম্মুখসারিতে থাকা দলটির নীতিনির্ধারকরা।
১১ দলীয় জোটের ব্যানারে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬টিতে জয় পেয়েছে এনসিপি। নতুন দল হিসেবে এ ফলাফলকে ইতিবাচক বলেই দেখছেন নেতারা। তবে নির্বাচনের আগে শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ১৮ জন নেতার পদত্যাগ এবং তৃণমূলের কিছু বিচ্ছিন্নতা দলকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। এখন সেই দূরত্ব কমিয়ে ঐক্য ফিরিয়ে আনাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
এ লক্ষ্যে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি বিশেষ বৈঠক ডেকেছে দলটি। দলীয় সূত্র জানায়, বৈঠকে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস, তৃণমূল শক্তিশালীকরণ এবং অভিমানে সরে যাওয়া নেতাদের পুনরায় সম্পৃক্ত করার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। যেসব পদত্যাগপত্র জমা পড়েছে, সেগুলো এখনও গ্রহণ করা হয়নি-এটিকে সমঝোতার সুযোগ হিসেবে দেখছেন এনসিপির নেতারা।দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত আমাদের সময়কে বলেন, এনসিপির বড় শক্তি তারুণ্য। একসঙ্গে কাজ করলে মতভেদ থাকতেই পারে, তবে সেগুলো মেনে নিয়েই এগোতে হয়। যারা
সরে গেছেন, তাদের কারও পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি। দলের দরজা সবার জন্য খোলা। অতীতে আমরা একসঙ্গে আন্দোলন করেছি, আগামীতেও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চাই।
শীর্ষ নেতাদের মতে, অল্প প্রস্তুতি নিয়েই প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে নেমেছিলেন। সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা ও সময়ের ঘাটতি সত্ত্বেও তারা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছেন। অনেক নতুন মুখ প্রত্যাশার চেয়ে ভালো সাড়া পেয়েছেন বলেও দাবি তাদের। নেতারা মনে করছেন, মানুষের মধ্যে দলটির প্রতি আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছেÑ যা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত।
তবে তৃণমূল পর্যায়ে সুসংগঠিত কাঠামোর অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। লজিস্টিক সহায়তা, প্রচারণা সমন্বয় ও ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় অনেক প্রার্থী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি আসনে কাক্সিক্ষত ফল আসেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের মাঠে আরও সক্রিয় উপস্থিতি থাকলে ফলাফলে চমক দেখা যেতে পারত। মাঠপর্যায়ে নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা কর্মীদের মনোবল বাড়ায়, ভোটারদের মধ্যেও আস্থা তৈরি করে। এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটি আগাম পরিকল্পনা, প্রার্থী বাছাই, প্রশিক্ষণ ও প্রচার কৌশলে পরিবর্তনের চিন্তা করছে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন, কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ দিকে দলত্যাগীদের ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেকে এখনও অনীহা প্রকাশ করছেন। তাদের অভিযোগ, দলটি আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে গেছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে আপাতত ফেরার ইচ্ছা নেই বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। তবে এনসিপি নেতৃত্ব বিষয়টিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক ভুল বোঝাবুঝি ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের ফল হিসেবে দেখছে। ইতোমধ্যে কয়েক দফা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে এবং তা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এনসিপির সাবেক যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালিন বলেন, ব্যক্তিগতভাবে যেসব কারণে পদত্যাগ করেছি, সেগুলোর সুরাহা না হলে দলে ফেরার কারণ দেখি না। বর্তমান নেতৃত্বের আপসকামিতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন জুলাই-যোদ্ধাদের জন্য জীবন-মরণ প্রশ্ন। এখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই; তা না হলে অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।
দলটির একাধিক নেতা মনে করছেন, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও সংগঠনের দুর্বলতা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবও সামনে এসেছে। তাই ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে কাঠামোগত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, দলটি মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তার কিছুটা ক্ষয় হয়েছে। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটিয়ে সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান তুলে ধরতে পারলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে। অন্যথায় ভাঙনের প্রভাব ভবিষ্যৎ রাজনীতিতেও পড়তে পারে।
ফলে বলা যায়, নির্বাচনী সাফল্যের পাশাপাশি সাংগঠনিক সংহতি রক্ষা এখন এনসিপির বড় চ্যালেঞ্জ। ২৬ ফেব্রুয়ারির বিশেষ বৈঠকের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবেÑ দলটি ঐক্যবদ্ধ পথে এগোতে পারবে, নাকি অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য আরও জটিল হয়ে উঠবে।
















