মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের একাধিক শহরে বোমাবর্ষণ করার পর তেহরানও পাল্টা জবাব দিয়েছে। ইরান থেকে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে ওই অঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ করে দিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ।গত কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন রাষ্ট্র তাদের কূটনীতিক ও নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের বিষয়ে সতর্ক করে আসছিল। অনেক দেশ ইতিমধ্যে তাদের নাগরিকদের দ্রুত ওই এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। ইরান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, আক্রান্ত হলে তারা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে।কয়েক দশক ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনার এক বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৮টি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।
১৯৫৮ সালের জুলাই মাসে লেবানন সংকটের সময় প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। সে সময় প্রায় ১৫ হাজার মেরিন ও সেনা সদস্য সেখানে অবস্থান করছিল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। বড় স্থায়ী ঘাঁটি ছাড়াও ছোট ছোট সম্মুখবর্তী সাইটগুলোতেও এই সেনারা ছড়িয়ে আছেকাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবেই মার্কিন সেনার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই ঘাঁটিগুলো মূলত আকাশ ও নৌ অভিযান, লজিস্টিকস, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং শক্তি প্রদর্শনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঘাঁটিটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি। ২৪ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই ঘাঁটিতে ড্রোনসহ প্রায় ১০০টি যুদ্ধবিমান রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রায় ১০ হাজার সৈন্যের এই ঘাঁটিটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সম্মুখ সদর দপ্তর হিসেবে কাজ করে। ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তান অভিযানে এই ঘাঁটির ভূমিকা ছিল অপরিসীম।ব্রিটিশ নৌ-স্থাপনা এইচএমএস জুফেয়ারের স্থলে নির্মিত এই ঘাঁটিতে প্রায় ৯ হাজার সামরিক ও বেসামরিক কর্মী রয়েছেন। মার্কিন নৌবাহিনীর ‘পঞ্চম নৌবহর’-এর প্রধান কেন্দ্র এটি। পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ও আরব সাগরে চলাচলকারী জাহাজ ও বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর কাজ।আজ বাহরাইনের এই বিমানঘাঁটিতে হামলার খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।কুয়েত সিটি থেকে ৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি প্রধান লজিস্টিক ও কমান্ড হাব। ১৯৯৯ সালে নির্মিত এই ঘাঁটিটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের রসদ সরবরাহের মূল কেন্দ্র। কুয়েতে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা রয়েছে।প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনার এই ঘাঁটিটি মূলত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আকাশপথে যুদ্ধের সহায়তা দেয়। এখানে এফ-২২ র্যাপ্টর স্টিলথ ফাইটার এবং অত্যাধুনিক নজরদারি ড্রোন ও এওয়াকস (এডব্লিউএসিএস) সিস্টেম মোতায়েন রয়েছে।উত্তর ইরাক ও সিরিয়ায় আকাশ অভিযানের জন্য এই ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হয়। এখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা কুর্দি ও ইরাকি বাহিনীকে পরামর্শ দিয়ে থাকে। ইরাকে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা রয়েছে।অন্যান্য দেশের মধ্যে জর্ডানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এবং সিরিয়ায় প্রায় ২ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি লেভান্ত অঞ্চলে মার্কিন অভিযানের প্রধান কেন্দ্র। এ ছাড়া সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মার্কিন সেনা রয়েছে, যাদের মূল কেন্দ্র রিয়াদের কাছে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি। তুরস্কের ইনসিরলিক বিমানঘাঁটিতেও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার গুঞ্জন রয়েছে।
















