ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের নিন্দা জানাতে ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে, এক ঠান্ডা শীতের দিনে নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) সামনে কয়েকজন বিক্ষোভকারী জড়ো হয়েছিলেন। তখন গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ চলছিল প্রায় ১০০ দিন ধরে।আদালতের ভেতরে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে আইরিশ আইনজীবী ব্লিন নি ঘরালাইঘ যখন বক্তব্য রাখছিলেন, তখন গাজার অনেক ফিলিস্তিনি ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচার দেখছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তখন বোমার আঘাত থেকে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত।দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিজেতে অভিযোগ করেছিল যে, গাজায় ইসরায়েলের অভিযান গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। আইনজীবী নি ঘরালাইঘ বলেছিলেন, ইতিহাসে এই প্রথম এমন গণহত্যা, যেখানে শিকাররা নিজেরাই তাদের ধ্বংসের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করছে, এই আশায় যে বিশ্ব হয়তো কিছু করবে।
তিনি আদালতকে জানান, প্রতিদিন গড়ে ২৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন, যাদের মধ্যে ৪৮ জন মা। প্রতি ঘণ্টায় দুইজন মা এবং পাঁচজন শিশু মারা যাচ্ছে। তখন পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।২৬ জানুয়ারি আইসিজে রায় দেয় যে গাজায় গণহত্যার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে এবং ইসরায়েলকে সাময়িক ব্যবস্থা নিতে বলে। একইসঙ্গে গণহত্যা কনভেনশনের ১৫৩টি সদস্য দেশকে তাদের প্রতিরোধের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয়।
কিন্তু তারপরও যুদ্ধ থামেনি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। আর এই পুরো সময়টাতেই ইসরায়েলে অস্ত্রের সরবরাহ চলতে থাকে।
আল-জাজিরার অনুসন্ধানে যা বেরিয়েছে
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা মাসের পর মাস অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছে, আইসিজের রায়ের পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে যেতে থাকে।
ইসরায়েলের কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানি তথ্য, শুল্ক রেকর্ড এবং তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে আল-জাজিরা যে চিত্র তুলে ধরেছে তা চমকে দেওয়ার মতো। আইসিজের রায়ের পর অস্ত্র আমদানি আরও বেড়ে যায়। বেশিরভাগই ছিল গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র।
শীর্ষ পাঁচ সরবরাহকারী দেশ:
যুক্তরাষ্ট্র
ভারত
রোমানিয়া
তাইওয়ান
চেক প্রজাতন্ত্র
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েলে ২,৬০৩টি সামরিক সরঞ্জামের চালান এসেছে। মোট মূল্য ৩.২২ বিলিয়ন ইসরায়েলি শেকেল (প্রায় ৮৮৫ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে ৯১ শতাংশই আইসিজের রায়ের পর।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের রায় জানার পরও যেসব দেশ অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে গেছে, তারা গণহত্যায় সহযোগিতার দায় এড়াতে পারবে না।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রেস এবং ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের অধ্যাপক গেরহার্ড কেম্পের মতে, গণহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু চূড়ান্ত রায়ের পর নয়, ঝুঁকি দেখামাত্রই শুরু হয়। জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বলেছে যে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে।
অনেক দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে বা অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করার কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তবে সরবরাহ চলতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ:
চীন: আইসিজের রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধের সময়ও অস্ত্রের চালান পাঠিয়েছে।
তুরস্ক: এরদোয়ান জোরালো সমালোচনা করেছেন, কিন্তু শুল্ক তথ্যে দেখা যায় চালান বন্ধ হয়নি।
ব্রাজিল: আইসিজের পদক্ষেপকে বাধ্যতামূলক বলেছে, কিন্তু অস্ত্রের কিছু অংশ পাঠিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র একাই মোট আমদানির ৪২ শতাংশের বেশি জুগিয়েছে। ভারত দ্বিতীয় স্থানে (২৬ শতাংশ)।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক প্যাট্রিক উইলকেন বলেন, ইসরায়েল একা এত বড় মাপের বোমাবর্ষণ চালাতে পারত না। এর জন্য বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
আল-জাজিরার এই অনুসন্ধান প্রমাণ করে যে, গণহত্যার ঝুঁকির কথা জানার পরও অনেক দেশ শুধু নীরব থাকেনি, বরং সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে।
















