বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের উপস্থিতিতে এসব স্মারক সই হয়। এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রূপরেখা, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।গতকাল দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় পর্বের পরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি কিয়াং। অভিবাদন মঞ্চে তারেক রহমান ও লি কিয়াংকে সশস্ত্র সালাম দেয় চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকশ দল। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেওয়া হয়। দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন। পরে দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার খবর অনুযায়ী, বৈঠকে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বলেন, কৌশলগত পারস্পরিক আস্থা সুদৃঢ় করতে, বাস্তবমুখী সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে এবং উভয় দেশের জনগণের জন্য আরো বেশি সুফল বয়ে আনতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চীন প্রস্তুত রয়েছে। চীন ও বাংলাদেশ ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন পথ অনুসরণের ক্ষেত্রে চীন দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশকে সমর্থন করে এবং নতুন সরকারের প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থন রয়েছে। তিনি আরো বলেন, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতা এগিয়ে নিতে, বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি উন্নত মানের পণ্য আমদানি করতে, সক্ষম চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে সহায়তা করতে এবং নতুন জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য-যোগাযোগের মতো উদীয়মান শিল্পখাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে আগ্রহী।
সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ সরকার ‘এক-চীন’ নীতিতে দৃঢ়ভাবে অবিচল এবং যে কোনো ধরনের ‘তাইওয়ান স্বাধীনতা’র বিরোধী। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে চীনের সহায়তায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে এবং উভয় দেশের উন্নয়ন কৌশলের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে আগ্রহী। বৈঠকের পর, তারেক রহমান ও তার প্রতিনিধিদল গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত এক ভোজসভায় যোগ দেন।শি জিনপিং-তারেক রহমান বৈঠক আজ :প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরের শেষদিন আজ শুক্রবার দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব পিপল’-এ বৈঠক হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, এ বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর আজ গ্রেট হলে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সাক্ষাত্ এবং চীনের জাদুঘর পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা।
১৩ সমঝোতা স্মারক সই :বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল বিকালে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এই সমঝোতা স্মারকগুলো সই হয়। সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এক সাংবাদ সম্মেলনে জানান, সমঝোতা স্মারকগুলো মূলত বিনিয়োগ সহযোগিতা, সবুজ উন্নয়ন (গ্রিন ডেভেলপমেন্ট) ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সই করা হয়েছে। এছাড়া, বৈঠকে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা (জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যান) নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থাত্ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়ে এমওইউ হয়েছে। একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি পৃথক কো-অপারেশন প্ল্যান সই হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানি বিষয়েও একটা এমওইউ হয়েছে।
তিনি বলেন, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনে সহযোগিতায় দুটো পৃথক এমওইউ হয়েছে। গণমাধ্যম খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে চীন সরকার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি তাদের সম্পূূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। ট্রেড, এডুকেশন, কালচার, বাণিজ্যসহ সকল বিষয়ে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে চায়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়েও কথা বলেছেন। এ বিষয়ে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছে
















