ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতার কারণে জাপানের অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। জাপানি গণমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে সময়কালে দেশটির তেল আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কমেছে।এই বিশ্লেষণ করতে ইউরোপভিত্তিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার’র ট্যাংকার ট্র্যাকিং তথ্য ব্যবহার করেছে গণমাধ্যমটি। এতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের চালান মার্চ-মে সময়ে ৪৮ শতাংশ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ, বিশ্বব্যাপী মোট তেল রফতানি কমবে মাত্র ১০ শতাংশ।উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ২৯ শতাংশ এবং আরব আমিরাতের রপ্তানি ৩৩ শতাংশ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে কুয়েত ও ইরাকের রপ্তানি ৯০ শতাংশেরও বেশি কমার আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরানেরর তেল রপ্তানি প্রথমদিকে স্থিতিশীল থাকলেও মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে তা ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।হরমুজে কড়াকড়ির কারণে বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি করছে সৌদি। কিন্তু, দেশটির যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় সামগ্রিক রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেছে। লোহিত সাগর থেকে এশিয়ায় যেতে ইয়েমেনের বাব এল-মানদাব প্রণালি পাড়ি দিতে হয়। সেখানে ইরান সমর্থিত হুথির উপস্থিতি ওই জলপথেও জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি করছে।
নিক্কেই এশিয়া বলছে, তেল আমদানির পতন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে জাপানে। ২০২৫ সালের মার্চ-মে সময়ে দেশটি বিশ্বে সপ্তম বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ছিল। কিন্তু, ২০২৬ সালের একই সময়ে জাপানের আমদানি কমার হার ছিল চতুর্থ সর্বোচ্চ। এই ঘাটতি পূরণে টোকিও এখন যুক্তরাষ্ট্রের তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
যুদ্ধের আগে ফেব্রুয়ারিতে জাপানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসত। মে মাসে তা কমে ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তেলের অংশ ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে জাপান মার্চের শেষ দিক থেকে কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার শুরু করেছে। দেশটির হাতে এখনও ২০০ দিনের বেশি ব্যবহারের উপযোগী তেল মজুত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণমাত্রায় নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ফিরে আসবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। অনেকের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ফলে জাপানের জন্য বিকল্প জ্বালানি উৎস বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও প্রভাব পড়েছে। ভিয়েতনামের তেল আমদানি ৫১ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ার আমদানি ৪৩ শতাংশ কমেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক চীন গত বছর তাদের মোট কেনার ৩০ শতাংশ তেল কিনেছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তবে, মার্চ-মে সময়ে তাদের আমদানি ১৮ শতাংশ কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক ভারতের আমদানি মার্চ-মে সময়ে তিন শতাংশ কমেছে। দেশটি দ্রুত রাশিয়া ও ভেনিজুয়েলা থেকে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, এশিয়ার তুলনায় ইউরোপ তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অঞ্চলটি নর্থ সি, যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর আফ্রিকা ও কাসপিয়ান সাগর থেকে বহুমুখী সরবরাহ পেয়ে থাকে। মার্চ-মে সময়ে গ্রিসের তেল আমদানি ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের ৯ শতাংশ এবং স্পেনের সাত শতাংশ তেল আমদানি বেড়েছে।
















