ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র লড়াই এক সপ্তাহে গড়ালেও বিশ্লেষক ও মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এ যুদ্ধের বড় প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে।
একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এই সংঘাত মাস নয়, বরং দিনের ব্যাপার। ইরানের চেয়ে ইসরায়েল অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
’ ইসরায়েল আধুনিক অস্ত্র এবং বড় অস্ত্র মজুদের দিক থেকে অনেক এগিয়ে। অপরদিকে, ইরান অস্ত্রের সংকটে ভুগছে এবং সমন্বয়েও সমস্যায় পড়েছে, বিশেষ করে ইসরায়েলি হামলায় শীর্ষ জেনারেল ও সহকারীদের নিহত হওয়ার পর।
আরেক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এই পরিস্থিতি ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষে যৌথভাবে আক্রমণ চালানো কঠিন করে তুলেছে।’ তবে সবকিছুর পরও, ওয়াশিংটনে উদ্বেগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অস্ত্র মজুদের অবস্থা নিয়ে।
কারণ, এইসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ ইসরায়েলকে দেওয়া হয়েছে অথবা মার্কিন বাহিনীর নিজস্ব প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায়।
এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এই সংঘাত আমাদের অস্ত্র মজুদের ওপর বড় ধাক্কা দিচ্ছে।’ তবে তিনি এটাও যোগ করেন, ‘সময় ইরানের বিরুদ্ধে কাজ করছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়।’
গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করেছে লোহিত সাগরে হুথিদের হামলা প্রতিরোধে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইয়েমেনে হুথিদের নেতৃবৃন্দ ও অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে অভিযান শুরু করে, যেখানে বিপুল পরিমাণ এসএম-২, এসএম-৩ ও এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে। গত মাসে হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত এই যুদ্ধও মার্কিন অস্ত্র ভাণ্ডারকে ব্যাপকভাবে খালি করেছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিওর ইস্ট পলিসির সামরিক ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক মাইকেল আইজেনস্টাড বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সংকট থাকলেও, আমাদের অস্ত্র মজুদের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত আরো বড় কারণে—যদি চীন কিংবা কোরীয় উপদ্বীপে সংকট সৃষ্টি হয়, সেখানে গোলাবারুদের ব্যবহার আরও বেশি হবে।’
বুধবার মার্কিন সেনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার সতর্ক করে বলেন, ‘এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক জাতীয় নিরাপত্তা মুহূর্ত।
দমনহীন, আগ্রাসী শাসকরা এগিয়ে আসছে, আর যুদ্ধের প্রকৃতিও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।’ তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা বাজেটে প্রয়োজনীয় কৌশলগত বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে।
ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০০ ইতোমধ্যেই ছোড়া হয়েছে। ইরান আরো অনেক কম খরচের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে, যেগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলে সম্ভবত দুটি `টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স ইউনিট’ মোতায়েন করেছে, যা গত বছরের হামলায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েল বর্তমানে তার ইন্টারসেপ্টর (আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র) মজুদ পুনরায় পূরণে সমস্যায় পড়ছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বহুতলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যার একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় চলে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যারো-২ ও অ্যারো-৩ (দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে), ডেভিড’স স্লিং এবং আয়রন ডোম (স্বল্প পাল্লার হামলা প্রতিহত করতে)।
আইজেনস্টাড বলেন, ‘ইসরায়েল তাদের প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার দ্রুত খরচ করছে।’ তবে তিনি বলেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করতে সক্ষম হওয়ায় হামলার সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে এবং হুমকি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানে হামলায় অংশ নেবে কি না, তা ইসরায়েলের অতিরিক্ত ইন্টারসেপ্টরের প্রয়োজন নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
আইজেনস্টাড আরো বলেন, ‘ইরান হয়তো যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চাইবে, তবে একটি সময় আসবে যখন নিজেদের সশস্ত্র বাহিনী, সামরিক শিল্প এবং জাতীয় অবকাঠামোর ওপর ক্ষয়ক্ষতির কারণে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ইরানের জন্য লাভজনক নাও থাকতে পারে। তখন ইরান হয়তো যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরিতে অন্যত্র উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।’
বুধবার হোয়াইট হাউসে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনো ইরানে হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বলেন, ‘আমি যুদ্ধ করতে চাই না। তবে যদি যুদ্ধ করা আর ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়, তাহলে যা করার দরকার, তাই করতে হবে।’
সূত্র : আলআরাবিয়া
















