বিশ্বরাজনীতিতে আচমকা মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে বৃহস্পতিবার স্বীকৃতি দিল রাশিয়া। অনেক দেশ তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। বৃহস্পতিবার থেকে মস্কোর আফগান দূতাবাসের সামনে উড়ছে তালেবানের সাদা পতাকা। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসেই অবশ্য মিলেছিল এর ইঙ্গিত।
তখন সন্ত্রাসবাদীদের তালিকা থেকে তালেবানকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেয় রুশ প্রশাসন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞদের একাংশ বরাবর দাবি করে এসেছেন, প্রায় ২০ বছর পর তালেবানের উত্থানের পেছনে পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল রাশিয়া ও চীনের। রাশিয়ার বৃহস্পতিবারের সিদ্ধান্তের পর সেই দাবি আরো জোরালো হয়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়ছে আফগানিস্তানের গুরুত্ব।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাবিশ্বের সমর্থনপুষ্ট আশরাফ গনি সরকারকে হটিয়ে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পরই সিদ্ধান্ত হয়, এই সরকারকে বিশ্বের কোনো দেশই স্বীকৃতি দেবে না। ফলে বলা চলে, প্রায় চার বছর পর রাশিয়ার এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত ভূ-রাজনীতিতে বিশেষ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দেশগুলোও সম্ভবত তালেবানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কে আরো জোর দেবে। বিশেষ করে, ইরানের সঙ্গে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত থাকায় বর্তমান পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানের গুরুত্ব ক্রমে বাড়ছে।
চীনের ভূমিকা
এদিকে সরাসরি স্বীকৃতি না দিলেও অনেক দেশই ২০২১ সালের পর থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত আলাপ-আলোচনা, এমনকি তালেবান নিযুক্ত আফগান রাষ্ট্রদূতকে স্বীকৃতি দেওয়া। এই বিষয়ে সর্বপ্রথম পদক্ষেপ নেয় চীন। ২০২৪ সালে বেইজিংয়ে তালেবান রাষ্ট্রদূতকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে তালেবান সরকারকে অবশ্য তারা এখনো স্বীকৃতি দেয়নি।
এই প্রসঙ্গেই উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার তালেবান নিযুক্ত আফগান দূত গুল হাসানকে মস্কোর অতিথি বলে স্বীকৃতি দিয়েছে রুশ সরকার। রাশিয়ার এই স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেছে চীন।
ভারতের ভূমিকা
অন্যদিকে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি না দিলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক বরাবর বজায় রেখেছে ভারত। পাশাপাশি হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে পাঠিয়েছে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা। আফগান নারী ও শিশুদের মানবাধিকার খর্ব হওয়ায় ভারত কড়া সমালোচনাও করেছে।
এ ছাড়া ২০২২ সালেই কাবুলে চালু হয় ভারতীয় দূতাবাস। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি দুবাইয়ে দেখা করেন তালেবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মৌলবি আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে।
সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত থামতেই ফের ‘আফগান তাস’ সামনে আনে ভারত। মুত্তাকির সঙ্গে সরাসরি ফোনে আলাপচারিতায় যোগ দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ২০২১ সালের পরে দুই দেশের দুই মন্ত্রীর এই প্রথম কথা।
কূটনীতিকদের দাবি, তালেবান ও ভারতের সম্পর্ক আগামী দিনে অন্য খাতে বইলেও বইতে পারে। তবে সবই হবে ভারসাম্য রেখে।
আফগানিস্তানের সীমান্ত লাগোয়া পাকিস্তানের খাইবারপাখতুনখোয়া প্রদেশে হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবানকে আশ্রয় দিচ্ছে আফগানিস্তান—পাকিস্তানের এই অভিযোগ থাকায় আফগান-পাক সম্পর্কের ফাটল ক্রমে চওড়া হচ্ছে। পাকিস্তান ও তালেবানের সম্পর্ক বরাবরই বেশ জটিল ও বহুমাত্রিক।
জার্মানি যেভাবে দেখছে রুশ সিদ্ধান্তকে
২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পরই একটি সাক্ষাৎকালে তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছিলেন, জার্মানির সঙ্গে একটা দৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করার কথা তারা ভাবছেন। যদিও ২০২১ সালেই কাবুলে জার্মান দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি একাধিকবার তালেবানের মানবতাবিরোধী পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছে জার্মান প্রশাসন।
বার্লিন স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনোভাবেই তালেবানকে সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয় তারা। অর্থাৎ রাশিয়ার পদক্ষেপ ও জার্মানির পদক্ষেপের মধ্যে ফারাক রয়েছে।
যদিও বৃহস্পতিবারই জার্মানির অন্তর্বর্তী মন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট জানান, তিনি তালেবানের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ শুরু করতে চান। তবে তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক এক বিশেষ কারণ। যেসব আফগান জার্মানিতে অপরাধমূলক কার্যকলাপের জন্য গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করাই হবে সেই সংলাপের মূল উদ্দেশ্য।
বর্তমানে জার্মানি ও তালেবানের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখে তৃতীয় পক্ষ কাতার। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে সেই পক্ষের সহায়তায় অভিযুক্ত ২৮ আফগান নাগরিককে ফেরত পাঠিয়েছিল জার্মান সরকার। তার পর থেকে আর সেই পদক্ষেপ কার্যকর হয়নি, যা ক্রমে ইন্ধন জোগাচ্ছে জার্মানির নিজস্ব রাজনৈতিক চাপান-উতোরে। বিশেষ করে, গত বছর জার্মানির বহু জায়গায় হামলার ঘটনা ঘটেছে, সন্দেহের তালিকায় রয়েছে একাধিক আফগানের নাম। জার্মানির নতুন সরকার তাই সিদ্ধান্ত নেয়, যত দ্রুত সম্ভব বিদেশি অপরাধীদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানো ও অবৈধ অভিবাসন রুখে দেওয়া হবে।
ডোব্রিন্ট এ-ও জানিয়েছেন, আফগানিস্তানের পাশাপাশি সিরিয়াতেও শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা শুরু করতে চান তারা। ২০১২ সাল থেকে তা বন্ধ হয়ে রয়েছে। চেষ্টা করা হচ্ছে সিরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের, তবে এখনো উত্তর আসেনি।
প্রসঙ্গত, ১৫ বছর পর বৃহস্পতিবার সিরিয়ার এক অভিবাসীকে তার দেশে ফেরত পাঠায় অস্ট্রিয়া। এপ্রিল মাসেই অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেয়ারহার্ড কার্নার ও জার্মানির তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্ত্রী ন্যান্সি ফেজার দামেস্কে সফরে যান। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল অভিযুক্ত ও বিপজ্জনক সিরীয় অভিবাসীদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা।
পশ্চিমা দুনিয়ার প্রায় সব দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই জানিয়েছে, তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিতে তারা রাজি নয়। একই সুর শোনা গিয়েছে ফ্রান্স ও চেকিয়ার কথাতেও। শুধু মানবাধিকার রক্ষার কারণেই কৌশলগত সংলাপ চলে ২০২১ সাল থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালের পর থেকে আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফান্ড জব্দ করেছে, নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে একাধিক তালেবান নেতার ওপর।
কানাডা ও তাজিকিস্তান সরাসরি সন্ত্রাসবাদী বলেই মনে করে তালেবানকে। রাশিয়ার এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সার বিশ্বের একাধিক মানবাধিকার সংগঠন। তাদের দাবি, তালেবান সরকার এবার আফগানিস্তানের নারী ও শিশুদের ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার চালাতে পারে।
রাশিয়ার ‘ডমিনো’ প্রভাব
তবে কূটনীতিকদের দাবি, রাশিয়া মূলত মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াতে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এই সিদ্ধান্ত সেই কারণেই। পাশাপাশি বাণিজ্য, জ্বালানি সম্পদ, অবকাঠামোসহ একাধিক বিষয়ে তালেবদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের শক্তি আরো বাড়াতে চায় রাশিয়া। আর এই সিদ্ধান্তের বিশ্বব্যাপী প্রভাব পড়তে পারে, যা ঠিক ‘ডমিনো’র মতো। অর্থাৎ চীন, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ধীরে ধীরে এই একই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে পারে। অন্য খাতে বইতে পারে ভূ-রাজনীতি।
















