জাতির মঞ্চে বাজেট কেবল সংখ্যা নয়; এটি একটি সাংবিধানিক ইশতেহার। এটি প্রকাশ করে একটি রাষ্ট্র তার জনগণকে কীভাবে দেখে, কীভাবে তাদের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেয় এবং কী ধরনের অর্থনৈতিক সভ্যতা গড়ে তুলতে চায়।
১০ জুন পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে ২০২৫-২৬ সালের বাজেট উপস্থাপন করেন। এই বাজেটটি এমন একটি জাতির সামনে উত্থাপন করা হয় যারা আর্থিক ক্লান্তি, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং কাঠামোগত ভাঙনের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধ।
বাজেটটি সংস্কারের নামে উপস্থাপন করা হয়েছে—ডিজিটালাইজেশন, গ্রিন ফাইন্যান্স এবং শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতিসহ। কিন্তু এটি মর্মান্তিকভাবে স্পষ্ট, এই বাজেট কোনো পুনরুদ্ধার নয় বরং একটি প্রদর্শনী—এবং এর পেছনে যে বিপর্যয়কর সত্য লুকিয়ে আছে তা হলো— পাকিস্তান ভবিষ্যতের জন্য বাজেট করছে না, এটি টিকে থাকার জন্য বাজেট করছে এমন একটি ব্যবস্থায়, যা ব্যর্থ হওয়ার জন্যই তৈরি।
সরকার সবচেয়ে বেশি প্রচার করেছে যে, মুদ্রাস্ফীতি দুই বছর আগে ২৯.২ শতাংশ থেকে কমে ৪.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু এটি নীতির কোনো বিজয় নয়; এটি ধ্বংসের গাণিতিক ফলাফল।
পাকিস্তানে মুদ্রাস্ফীতি কখনোই স্থিতিশীল অর্থনীতির কারণে কমে না। এটি কমে যখন অর্থনৈতিক কার্যক্রম ভেঙে পড়ে। যখন জ্বালানির দাম নাগালের বাইরে চলে যায়, প্রকৃত আয় মরে যায়, মানুষ খাদ্য, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ কেনা বন্ধ করে দেয়—তখন দাম পড়ে যায়, কিন্তু জীবন নিজেই পড়ে যায়। সরকার হয়তো ৩.৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নিয়ে উল্লাস করতে পারে, কিন্তু এটি এমন প্রবৃদ্ধি নয়, যা উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি বা মূলধন গঠনের ওপর ভিত্তি করে।
এটি পরিসংখ্যানগত স্থিতিস্থাপকতা, বহু বছরের পতনের পর একটি অগভীর প্রত্যাবর্তন, যা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ এবং আমদানি সংকোচনের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে।
বাজেটের বহুল প্রচারিত প্রাইমারি সারপ্লাস—জিডিপির ২.৪ শতাংশ—এবং ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৭৪ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশে নামিয়ে আনা আপাতদৃষ্টিতে আর্থিক শৃঙ্খলার সংকেত দেয়। কিন্তু এর নিচে রয়েছে কর। করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল অর্থনীতি, চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত এবং এমনকি অবসরপ্রাপ্তদের ওপর; এবং দেশ প্রবেশ করছে তার দ্বাদশ আইএমএফ কর্মসূচিতে, যেখানে কোনো কাঠামোগত সংস্কারের দিশা নেই।
সংখ্যাগুলো কাজ করছে, কিন্তু জাতি কাজ করছে না।
অর্থনীতিকে না খাইয়ে শুধু দাতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য বাহ্যিক সৌন্দর্যের ছবি তৈরি করা হচ্ছে, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীল ইঞ্জিন এখনও তৈরি হয়নি। এখানেই বাজেট ২০২৫-২৬-এর কেন্দ্রীয় মিথ্যাটা লুকিয়ে আছে। পাকিস্তানের কোনো আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নেই, নেই কোনো রপ্তানি ভিত্তি, নেই কোনো শিল্প ক্লাস্টার, নেই কোনো প্রযুক্তি পাইপলাইন এবং নেই কোনো বিনিয়োগ নীতিমালা। যা আমরা অর্থনীতি বলে ডাকি, তা আসলে একটি ফাঁপা প্রজাতন্ত্রের বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা, যা চলে আমাদের রপ্তানিকৃত শ্রমের প্রবাসী আয়, ঋণ এবং ভূরাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে প্রাপ্ত সাহায্যের ওপর।
সূত্র : দ্য নিউজ।
















