পানিসম্পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘ফারাক্কার পানিবণ্টন চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে। এই চুক্তির অধীনে দুই দেশের একটি টেকনিক্যাল কমিটি নিয়মিতই মাঠ পর্যায় হতে তথ্য-উপাত্ত নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘চুক্তিটা নবায়ন করার ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত যা দরকার তা নিয়মিত সংগ্রহ করা হচ্ছে। এটা আমাদের ন্যায্য হিস্যা, এটার জন্য আমরা আমাদের অধিকারের জায়গা থেকে কথা বলব।
আরো যেহেতু আমাদের হাতে দেড় বছর সময় আছে সেহেতু আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি।’
আজ সোমবার রাজশাহীর চারঘাটে বড়াল নদীর উৎসমুখ পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘রাজশাহী নাটোরের ওপর দিয়ে প্রবাহমান বড়াল নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। বড়ালের ১৮ কিলোমিটার এলাকায় পানি প্রবাহ কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে।
’
উপদেষ্টা বলেন, ‘বড়ালের উৎসমুখে চারঘাট স্লুইসগেটটি সরিয়ে ফেলা হলে সমাধান হবে কি না, বড়ালে পানির প্রবাহ আসবে কি না, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর সাথে আটঘরিয়ার দিকে যুক্ত বড়াল নদীর আরো ১৮ কিলোমিটার খনন করে এ নদীর প্রবাহ আনা যাবে কি না, সেটির কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘নদীর প্রবাহ হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য, মানুষকে নদী ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য। নদীর প্রবাহ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হয়তো কিছু কিছু জায়গায় করতে হয়, কিন্তু নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যদি নদীটাই মরে যায়, তাহলে তো এটি মেনে নেওয়া যায় না।
’
তিনি আরো বলেন, ‘আগে স্লুইসগেটগুলো করা হয়েছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য। কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নদীকে মেরে ফেলা যাবে না। যদি বলা হয় যে, জমি অধিগ্রহণ করে নদী খনন করা হবে তাহলে এ ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হবে।’
উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘প্রাকৃতিক উপায়ে বড়াল নদীর কতটুকু আমরা ফেরত আনতে পারি সেজন্য কি পরিকল্পনা হতে পারে সেটা পাউবো ঠিক করবে। আমার পক্ষ থেকে পাউবোর কাছে বার্তা হচ্ছে নদীটিকে প্রাকৃতিক সিস্টেম হিসেবে দেখেই পরিকল্পনা করতে হবে ‘
পরিবেশ অধিদপ্তর, নদী রক্ষা কমিশনসহ নদীর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে সমন্বয় করে একটা ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনা করতে উপদেষ্টা সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, ‘বড়াল নদী প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য কর্মপরিকল্পনা যেন আমরা চূড়ান্ত করে যেতে পারি সেই চেষ্টাটা অব্যাহত থাকবে, বাকি কাজটুকু পরবর্তী সরকার এসে করবে।’
উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘পাউবোকে জানতে হবে কোথায় তাকে মানুষের কথা শুনতে হবে, কারণ এই প্রকল্পগুলো তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে করা নহে, এগুলো জনগণের স্বার্থে। জনগণই যদি এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তারা যদি বলে এটি পর্যালোচনা করতে হবে বা মডিফাই করতে হবে, তাহলে তা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণ যেটি চায় সেটিকে বিবেচনায় নিতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যে প্রকল্পই করুক না কেন তাকে জনগণের কথা শুনতে হবে। কারণ তা জনগণের অর্থেই করা হবে। সুতরাং, সে ক্ষেত্রে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হতে হবে।’
উপদেষ্টা এ-ও বলেন, ‘বালু বস্তুটা আর মাটি বস্তুটা একটা চরম লোভনীয়, ইটভাটার জন্য আর নির্মাণকাজের জন্য অবৈধ বালু তোলে আর বেআইনিভাবে পাহাড় কাটে, আর কৃষিজমির ওপরের মাটি কেটে নিয়ে চলে যায়, এ রকম ভয়ংকর অবস্থায় আমরা চলে গেছি। এ ভয়ংকর অনিয়মগুলো অনেকদিন ধরে জমা হয়েছে, এটা অনেকটা চরম পর্যায়ে চলে গেছে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, ‘৬৪ জেলার ডিসি এবং এসপিদের বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে তিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত এক সভা থেকে তাদের এ বিষয়ে ১০ দফা নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। দেশের সকল প্রশাসনকে বলা হয়েছে, কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে রাতের বেলায়ও অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে। অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে সরকার শক্ত অবস্থান নিয়েছে। আমরা সমগ্র দেশের জেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে মনিটর করছি।’
উপদেষ্টা নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার আটঘরিয়া নামক স্থানে বড়াল নদীর ওপর নির্মিত ৫ ভেন্ট রেগুলেটর এলাকা পরিদর্শন করেন।
এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল জোনের প্রধান প্রকৌশলী মো. মুখলেসুর রহমান, নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (পরিকল্পনা) মো. মোবাশ্বেরুল ইসলাম, রাজশাহী পানি উন্নয়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী, নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলামসহ রাজশাহী জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
















