সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভিসানীতিতে ব্যপক পরিবর্তন এনেছে। গত সপ্তাহে বিভিন্ন দেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলো সব ধরনের ভিসাপ্রত্যাশীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া অ্যাকাউন্ট ‘পাবলিক’ করতে বলেছে। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে তাদের পরিচালিত সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্টের তথ্য ভিসা আবেদনে সংযুক্ত করতে বলেছে।
বাংলাদেশ, ভারতসহ বেশ কিছু দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যারা এফ, এম বা জে শ্রেণির নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার জন্য আবেদন করছেন, তাদের সবাইকে নিজেদের সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্টের গোপনীয়তা সেটিং পাবলিক করে দিতে অনুরোধ করা হচ্ছে, যা ঘোষণার মুহূর্ত থেকে কার্যকর হবে।
এটি আবেদনকারীর পরিচয় ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যাচাইপ্রক্রিয়া সহজতর করতে সহায়তা করবে বলেও জানিয়েছে তারা।
অ্যাকাউন্টগুলো কেন নজরদারির আওতায়
মার্কিন ভিসা আবেদনকারীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের বিধান ২০১৯ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে। তবে নতুন এই ঘোষণাগুলো বিদেশি নাগরিকদের ওপর আরো বেশি নজরদারির ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনসংক্রান্ত কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে, অবৈধ অভিবাসীদের ওপর আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) অভিযান শুরু করার পটভূমিতে এই বর্ধিত নজরদারি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। ভূরাজনীতিতে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশগুলোর মধ্যে ক্রমেই বিভাজন বাড়ছে। এ কারণে সতর্কতার অংশ হিসেবে তার প্রশাসন আরো যাচাই-বাছাই করে ভিসাপ্রত্যাশীদের প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ মূলত আবেদনকারীদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক আগ্রহ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ‘উগ্র’ মতামত পর্যবেক্ষণ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কোন মাধ্যম বেশি নজরদারিতে
যেসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট আবেদনকারীদের ‘পাবলিক’ করতে হবে এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রেডিট, টাম্বলার, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, লিংকডইন, ইউটিউব, থ্রেডস ও ফেসবুক। এ ছাড়া ভিসা আবেদনকারীদের টিকটক ও উইচ্যাটের মতো বেশ কয়েকটি চীনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ব্লুস্কাই, ব্লগিং অ্যাকাউন্ট ও ব্যক্তিগত ওয়েবসাটের তথ্যও জানাতে হবে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ মূলত ভিসাপ্রত্যাশীর সব ধরনের ব্যক্তিগত ও পেশাগত অ্যাকাউন্ট কার্যক্রম, যেমন পোস্ট, প্রকাশিত ছবি বা ভিডিও, আগে করা মন্তব্য, মন্তব্যের উত্তর, ট্যাগকৃত ছবি বা পোস্ট, এমনকি ‘লাইক’ সম্পর্কেও জানতে চাইছে।
আবেদনকারীরা কিভাবে অনলাইন ‘ফুটপ্রিন্ট’ মুছবেন
ভিসাপ্রত্যাশীরা তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট পাবলিক করার ও মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য হস্তান্তর করার আগে, ব্যবহারকারীরা তাদের সংবেদনশীল বা ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলতে পারেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীরা প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধানে এটি করতে পারে।
আবেদনকারীরা তাদের অ্যাকাউন্টগুলো মুছেও ফেলতে পারেন। তবে এটি নজরদারি এড়ানোর উত্তম উপায় নয়। অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলার পরও বেশ কয়েকটি প্ল্যাটফরম কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে ব্যবহারকারীর ডেটা সংরক্ষণ করে। এর ফলে অতীত তথ্য খুঁজে বের করা অসম্ভব নয়।
ভিসা আবেদনকারীরা কত দিন অ্যাকাউন্ট পাবলিক রাখবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ। তবে নিরাপদ থাকার জন্য তারা ভিসা আবেদন জমা দেওয়ার সময় থেকে ভিসা পাওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় পর্যন্ত তাদের অ্যাকাউন্টগুলো খোলা রাখতে পারেন।
এই সিদ্ধান্ত কী আইনসম্মত
কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ভিসাপ্রত্যাশীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপারে জানতে জোর করতে পারে না। কিন্তু এটি মেনে না চললে ভিসা কার্যক্রমে বিলম্ব অথবা ভিসা পেতে ব্যর্থ হতে পারেন তারা। তবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি আইনিভাবে সঠিক নয়।
ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের (ইএফএফ) একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সোফিয়া কোপ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে বলেন, ‘মার্কিন সরকার গোপনীয়তানীতির একটি মৌলিক শর্ত লঙ্ঘন করেছে।’ এ ধরনের কার্যক্রম বাকস্বাধীনতাকে খর্ব করতে পারে, সেই সঙ্গে নিরাপত্তা হুমকি প্রতিরোধে এটি অকার্যকর হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
সূত্র : এনডিটিভি
















