২০১১ সাল। মাইক্রোসফটে তখন টালমাটাল অবস্থা। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিনের বাজারে তখন রীতিমতো ধুঁকছিল প্রতিষ্ঠানটি। প্রধান নির্বাহী স্টিভ বালমার ছিলেন প্রচণ্ড চাপে, তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জনও ছিল তুঙ্গে।
মাইক্রোসফটের সেই অভ্যন্তরীণ ডামাডোলের কেন্দ্রে ছিলেন কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিন।
যৌন অপরাধে (পাচারের মাধ্যমে কম বয়সী নারীদের যৌনকাজে বাধ্য করা) দায়ের করা ফেডারেল মামলায় ২০১৯ সালে কারাগারে যাওয়ার আগে এই ধনকুবেরের জীবন নিয়ে সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ বহু নথি প্রকাশ করেছে। নথিতে দেখা যায়, মাইক্রোসফটের ভেতরকার লোকজনের কাছ থেকে নতুন প্রধান নির্বাহী খোঁজার প্রতিটি মুহূর্তের হালনাগাদ তথ্য পেতেন এপস্টিন এবং সেই অনুযায়ী তাঁদের নিয়মিত পরামর্শও দিতেন তিনি।২০১১ সালের এক ই–মেইল বার্তায় এপস্টিনের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী অনেকটা খোশগল্পের ঢঙে লিখেছিলেন, ‘ঘটনা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।’ আংশিক গোপন রাখা ওই ই–মেইলে বলা হয়, মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী খোঁজার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। আর সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, যিনি দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা থেকে সরে গিয়েছিলেন, ৯ মাসের জন্য আবার ফিরে আসার কথা ভাবছেন।অন্য যেকোনো বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে মাইক্রোসফটের নীতিনির্ধারণী মহলে নিজের প্রভাব বিস্তারে বেশি সফল হয়েছিলেন এপস্টিন। একের পর এক সংযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি কোম্পানিটির অন্দরের খবর জেনে যেতেন। প্রধান নির্বাহী নির্বাচন থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাতব্য কার্যক্রম—সবকিছুতেই তাঁর বিশেষ নজর ছিল।
অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে ১৩ মাস জেল খেটে ২০০৯ সালে মুক্তি পান এপস্টিন। জেল থেকে বেরিয়ে সমাজে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় মাইক্রোসফটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এমন সুসম্পর্ক তাঁকে বেশ সাহায্য করেছিল। অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠান, যেমন এল ব্র্যান্ডস বা অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গেও তিনি একই ধরনের সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সে ক্ষেত্রে সফল হননিনথিপত্রে দেখা গেছে, এক দশকের বেশি সময় ধরে মাইক্রোসফটের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বড় বলয় গড়ে তুলেছিলেন এপস্টিন। এ তালিকায় ছিলেন এমনকি বিল গেটসও। আরও ছিলেন সাবেক প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা নাথান মিরভল্ড, উইন্ডোজ বিভাগের সাবেক প্রধান স্টিভেন সিনফস্কি, প্রযুক্তি গবেষণা বিভাগের সাবেক নির্বাহী লিন্ডা স্টোন ও মাইক্রোসফটের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য রিড হফম্যান। এ ছাড়া বিল গেটসের ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ও দাতব্য তহবিলের কর্মীরাও তাঁর পরিচিত গণ্ডিতে ছিলেন।এই কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন আর মাইক্রোসফটে নেই। তবে রিড হফম্যান এখনো পরিচালনা পর্ষদে বহাল আছেন। এপস্টিনের সঙ্গে গেটসের সম্পর্কের কথা আগেই বিস্তারিতভাবে সংবাদে এসেছে। তবে গেটস এখনো প্রতিষ্ঠানটিকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। আর নাথান মিরভল্ড গত বছরও মাইক্রোসফটের ৫০ বছর পূর্তির উৎসবে যোগ দিয়েছেন।
মাইক্রোসফট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতা এপস্টিন এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে ২০১৩ সালে তিনি বেশ ক্যাজুয়ালি তাঁর অন্য পরিচিত ব্যক্তিদের কোম্পানিটির নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ আছে কি না, জিজ্ঞাসা করতে শুরু করেন। ধনকুবের টম প্রিটজকারকে পাঠানো এক ই–মেইলে এপস্টিন লিখেছিলেন, ‘মাইক্রোসফট চালানোর ব্যাপারে কোনো আগ্রহ আছেমাইক্রোসফটের যোগাযোগপ্রধান ফ্রাঙ্ক শ বলেন, এপস্টিন ও ‘ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগ রাখা মাইক্রোসফটের সাবেক কর্মীদের’ মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া এসব ই–মেইল দেখে কোম্পানিটি হতাশ। সুনির্দিষ্টভাবে কারও নাম উল্লেখ না করে ফ্রাঙ্ক স্বীকার করেন, ই–মেইলগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে একজন সাবেক নির্বাহী, যিনি মূলত স্টিভেন সিনফস্কি—কোম্পানির অনেক গোপন ব্যবসায়িক তথ্য এপস্টিনের সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন।বিল গেটসের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মাইক্রোসফটের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। গেটস সম্প্রতি বলেছেন, তিনি শুধু দাতব্য কাজের তহবিল সংগ্রহের জন্য এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং নারীদের সঙ্গে এপস্টিনের অনভিপ্রেত আচরণের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে ‘বিরাট ভুল’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
এক বিবৃতিতে রিড হফম্যান বলেন, তিনি চান ট্রাম্প প্রশাসন এপস্টিন-সংক্রান্ত সব ফাইল প্রকাশ করুক এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনুক। তিনি আরও বলেন, ‘এপস্টিনের সব যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে এবং অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচনে গণমাধ্যম ও অনলাইনে যে কাজ হচ্ছে, তাকে আমি স্বাগত জানাই।’
মাইক্রোসফটের সঙ্গে এপস্টিনের প্রথম জানাশোনা শুরু ১৯৯৬ সালে। ওই সময় নাথান মিরভল্ড (পরবর্তী সময়ে কোম্পানির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান) সিয়াটল চিড়িয়াখানায় প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের সম্মানে একটি গালা ডিনারের আয়োজন করেন। লিন ফরেস্টার নামের এক টেলিকমিউনিকেশন নির্বাহী সেখানে অতিথি হিসেবে এপস্টিনকে নিয়ে আসেন বলে জানান লিন্ডা স্টোন (মাইক্রোসফটের প্রযুক্তি গবেষণা বিভাগের সাবেক নির্বাহী)। লিন্ডা ডিনারে এপস্টিনের পাশে বসেছিই–মেইলে পাঠানো এক বিবৃতিতে ফরেস্টার জানান, সেই জমকালো অনুষ্ঠানের কথা তাঁর মনে থাকলেও এপস্টিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না, তাঁর মনে নেই। তিনি আরও বলেন, ২০০০ সালের পর থেকে এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর কোনো কথা হয়নি।
তবে এপস্টিন স্টোন নামের এক নারীর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। স্টোন পরে মাইক্রোসফটের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সরাসরি স্টিভ বালমারের অধীন কাজ করেছিলেন। ২০০২ সালে মাইক্রোসফট ছাড়ার পর ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডের সেন্ট থমাসে স্টোন একটি সেমিনার আয়োজন করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদদের পাশাপাশি অর্থায়ন করেছিলেন এপস্টিন।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্টোন বলেন, বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য এপস্টিন খুব চমৎকারভাবে ও নাছোড়বান্দা হয়ে অনুরোধ করতেন, যাতে তিনি তাঁদের গবেষণায় অর্থায়ন করতে পারেন।
এদিকে এপস্টিনের সঙ্গে নাথান মিরভল্ডের (মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা) সম্পর্ক ছিল দুই দশকের। এ সম্পর্কের মাধ্যমেই জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে মাইক্রোসফটের আরও অনেকের সংযোগ তৈরি হয়। তাঁদের মধ্যে সখ্য এতটাই গভীর ছিল যে ২০০৩ সালে এপস্টিনের ৫০তম জন্মদিনের স্মারক বইয়েও অবদান রাখেন মিরভল্ড। মিরভল্ড তত দিনে মাইক্রোসফট ছাড়লেও বিল গেটসের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
সেই বইয়ে মিরভল্ড লিখেছিলেন, ‘কয়েক বছর আগে একটি অনুষ্ঠানে একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘জেফরি এপস্টিন কি আপনার আর্থিক ব্যবস্থাপনা দেখাশোনা করেন?’’ আমি জবাবে বলেছিলাম, না। তবে তিনি আমাকে জীবনযাত্রা (লাইফস্টাইল) বিষয়ে পরামর্শ দেন।’
মিরভল্ড তাঁর আফ্রিকা সফরে তোলা কিছু ছবিও সেই বইয়ে যুক্ত করেছিলেন। শব্দ দিয়ে কোনো কিছু বোঝানোর চেয়ে ছবিগুলো দেওয়াকেই তিনি বেশি ‘উপযুক্ত’ মনে করেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে সিংহ ও জেব্রার প্রজনন এবং বন্য প্রাণীদের উত্তেজিত অবস্থার ছবিও ছিল।
















