চমৎকার আবহাওয়ায় পারস্য উপসাগরের আকাশে যাত্রা শুরু করেছিল ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫। বোর্ডে ছিলেন ২৭৪ জন যাত্রী ও ১৬ জন ক্রু। কারো কল্পনাতেই ছিল না, এটাই হবে তাদের জীবনের শেষ উড়াল। উড্ডয়নের মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মাঝ আকাশেই ধ্বংস হয়ে যায় উড়োজাহাজটি।
প্রাণ হারান সবাই।
ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই, হরমুজ প্রণালির আকাশে। ইরানের বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সকালে উড়াল দেয় এয়ারবাস এ-৩০০ মডেলের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি। গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই।
সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে উড়াল দেওয়ার পরই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে উড়োজাহাজটি লক্ষ্য করে পরপর দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্র সোজা গিয়ে আঘাত হানে বিমানটিতে। সকাল ১০টা ৫৪ মিনিটে মাঝ আকাশে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় ফ্লাইট ৬৫৫।
এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে।
প্রশ্ন জাগে—ইরানের আকাশসীমায় বৈধভাবে উড়তে থাকা একটি বেসামরিক বিমান কেন ভূপাতিত করল যুক্তরাষ্ট্র? ঘটনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট।
১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়, যা চলে ১৯৮৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত। এই আট বছরব্যাপী সংঘাতে হরমুজ প্রণালি হয়ে ওঠে একটি সংবেদনশীল এলাকা—বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম কৌশলগত নৌপথ হিসেবে। ইরান চেষ্টা করছিল যেকোনোভাবে ইরাকের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে। এর ফলে পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে মাইন পাতা, রকেট ছোড়া এবং জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা।
ইরাকও ইরানের বিরুদ্ধে একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়। এ অবস্থায় পশ্চিমা শক্তিগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করে। ১৯৮৭ সালে ইরাক ভুল করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস স্টার্কে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দেয়, মৃত্যু হয় ৩৭ মার্কিন নাবিকের। ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে ইরান মাইন পেতে ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরের চার দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধ নেয়, ডুবিয়ে দেয় ইরানের একটি জাহাজ।
১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই সকালে ইউএসএস ভিনসেন্স হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন আরেক ফ্রিগেট ইউএসএস মন্টেগোমারির সঙ্গে যৌথভাবে মোতায়েন ছিল। তখন ইরানি গানবোটের সঙ্গে গোলাগুলি চলছিল। ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সি রজার্স তৃতীয় তখন ভিনসেন্সের নেতৃত্বে ছিলেন। সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে তিনি একটি বার্তা পান—ইরানের একটি ‘অজ্ঞাত’ উড়োজাহাজ যুদ্ধজাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে। বারবার সতর্কবার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। রাডার অপারেটররা ভুল করে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটিকে যুদ্ধবিমান এফ-১৪ হিসেবে শনাক্ত করেন।
ক্যাপ্টেন রজার্স সিদ্ধান্ত নেন—এটা হয়তো হামলার প্রস্তুতি। তাই প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। ফলাফল ছিল মর্মান্তিক: ফ্লাইট ৬৫৫ মাঝ আকাশে গুঁড়িয়ে যায়, নিহত হন সব যাত্রী ও ক্রু।
পরবর্তী তদন্তে মার্কিন নৌবাহিনী জানায়, এটি ছিল একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা। দাবি করা হয়, উড়োজাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় ছিল এবং অনুমোদিত গতির চেয়ে ধীরে উড়ছিল, তাই ভুল হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটি ভুল প্রমাণিত হয়—উড়োজাহাজটি ইরানের আকাশসীমায় ও অনুমোদিত বাণিজ্যিক বিমানপথেই ছিল।
ইরান এ ঘটনাকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দেয়। ১৯৮৯ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযোগ দায়ের করে। বহু আলোচনা–সমালোচনার পর, ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। ক্ষতিপূরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রদান করে এবং ‘গভীর সহানুভূতি’ জানায়। এই ঘটনার বিচার শেষ না হলেও সমঝোতার ভিত্তিতে মামলাটি নিষ্পত্তি হয়। তবে আজও এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। নিহত ২৯০ জনের পরিবার, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও সাধারণ মানুষ এ ঘটনার ন্যায়বিচার চেয়েছেন বারবার।
সূত্র : প্রথম আলো
















