জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইটা যুদ্ধক্ষেত্রে নয়— লড়াইটা হয় নিঃশব্দে, একা একা। যখন টাকার অভাবে স্বপ্নগুলো ম্লান হতে থাকে। এমন অনেক গল্পই হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ, কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা এসব গল্পকে হারাতে দেয় না। তারা হাত বাড়িয়ে দেয়, আলো জ্বালায় অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া পথিকের জন্য।
বসুন্ধরা গ্রুপ তেমনই এক আলোর দিশারী – যারা শুভসংঘের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২০ শিক্ষার্থীর জীবনে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, জোগাচ্ছে স্বপ্ন দেখার সাহস।
এই গল্পগুলো শুধু আর্থিক সহায়তার নয়, এগুলো মানবিকতার গল্প। মায়া আক্তার, যার বাবা-মা দুজনেই চলে গেছেন পৃথিবী থেকে, তার ভাই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। টিউশনির জন্য রাতের অন্ধকারে দূর-দূরান্তে যেতে হয় তাঁকে।
বসুন্ধরা শুভসংঘের বৃত্তি তাঁর জন্য শুধু টাকা নয়—একটি নিশ্চয়তা যে তিনি আর একা নন। ওসমান গনির বাবা ভ্যানচালক, সংসারের খরচই কুলোয় না, সেখানে উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা দুরূহ। তাঁর টিউশনির টাকাটা বাড়িভাড়া আর দু’বেলা খাবারে চলে যায়। বৃত্তিটি তাঁকে দিয়েছে শ্বাস নেওয়ার ফুরসত।
রাসেল সেখের বাবা ঋণ করে তাঁর পড়ার খরচ জোগাতেন, শেষে অসুস্থ হয়ে পড়েন। যখন সব দরজা বন্ধ মনে হচ্ছিল, তখন বসুন্ধরা শুভসংঘ এসে দাঁড়িয়েছিল তাঁর পাশে—একটি হাত বাড়িয়ে, একটি কথা বলে ‘তুমি পারবে।’
এখানে প্রতিটি নামের পিছনে আছে একেকটি সংগ্রামের ইতিহাস। সাবিনা ইয়াসমিনের বাবা মারা গেছেন এসএসসি পরীক্ষার আগে, মা অসুস্থ, ভাই-বোনদের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। মারুফা ইয়াসমিনের বাবা অটোচালক, ঢাকায় টিউশনি না পেয়ে তিনি প্রায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলেন।
বিথী রাণীর বাবার ব্রেইন টিউমার, সংসার চালানোর মতো শক্তিও নেই তাঁর। এইসব গল্পে বসুন্ধরা শুভসংঘ কেবল একটি নাম নয়—এটি এক জীবন্ত আশা, যা বলে ‘তোমার লড়াইয়ে আমরা আছি।’
শিক্ষাবৃত্তি শুধু মাসিক কিছু টাকা নয়, এটি একটি বার্তা—সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে, আমাদের নিজেদের কাছে। আমরা কতজনার পাশে দাঁড়াই? কতগুলো স্বপ্নকে আমরা ভেঙে যেতে দিই শুধু অর্থের অভাবে? বসুন্ধরা শুভসংঘের এই উদ্যোগ শুধু শিক্ষার্থীদেরই সাহায্য করছে না, এটি আমাদের সবার বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করছে, একটি প্রতিষ্ঠান যদি সত্যিই চায়, তাহলে সে হাজারো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
এই শিক্ষার্থীদের কৃতজ্ঞতা কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়। জান্নাতুল বুসরা মোনালিসা বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে আমিও কারো পাশে দাঁড়াব।’ রীতু রায়ের স্বপ্ন—তাঁর মায়ের কষ্টের প্রতিদান দেওয়া। আবু তালহা বিশ্বাস চান সমাজের জন্য কিছু করতে। এখানে প্রতিটি হৃদয়ে জ্বলছে একটি অঙ্গীকার ‘আমরা যখন সামর্থ্যবান হব, তখন অন্য কারো স্বপ্নের সঙ্গী হব।’
বসুন্ধরা শুভসংঘের এই প্রচেষ্টা একটি মানবিক আন্দোলন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কেবল ডিগ্রির জন্য নয়—এটি মর্যাদার জন্য, স্বাধীনতার জন্য, সমাজ বদলের হাতিয়ার। যখন একটি মেধাবী মাথা শুধু টাকার অভাবে পিছিয়ে পড়ে, তখন সমাজের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়। বসুন্ধরা শুভসংঘ সেই ক্ষতি পূরণে কাজ করছে, একটিই বিশ্বাস নিয়ে ‘শিক্ষাই পারে একটি জাতিকে আলোর পথে নিয়ে যেতে।’
এই গল্পের শেষ নেই। কারণ প্রতিদিন নতুন কেউ না কেউ যোগ হচ্ছেন এই স্বপ্নযাত্রায়। বসুন্ধরা গ্রুপের হাতটি যখন একজনের দিকে বাড়ে, তখন সেটি স্পর্শ করে হাজারো হৃদয়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের সবচেয়ে বড় গুণটি হলো—একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো। আর সেই দাঁড়ানোটাই যখন নিয়তিতে পরিণত হয়, তখনই জন্ম নেয় একটি সুন্দর পৃথিবীর।
















