দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামছে না। গাড়ির বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাসহ চালক-পথচারীদের অসচেতনতায় সড়কে প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ। হাজারো মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করছে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৩ বছরে সারা দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার জন, আহত ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬.৯৪ শতাংশ। আর মৃত্যুর হার বেড়েছে ৫.৭৯ শতাংশ। আহতের হার ১৪.৮৭ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। এ সংখ্যা যথাক্রমে মোট দুর্ঘটনার ৩৭.৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যার ৩৮.৪৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যার ১৪.৯৮ শতাংশ।জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস আজ। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। দেশের উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরতে এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহ্বানের মধ্য দিয়ে আজ দিবসটি পালিত হবে। সরকার ইতিমধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। প্রস্তাবিত আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে জরুরি চিকিত্সা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিকে সহায়তাকারী ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থা চালু এবং পুনরায় আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (আরটিএইচডি) প্রণীত খসড়া আইনটির লক্ষ্য হলো সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা, যানবাহন ও সড়ক অবকাঠামোর নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিত্সা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। গত ১৪ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।২০২০ সাল থেকে ঢাকার রাস্তায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৮৪ জন : পথচারীদের জন্য দেশে সবচেয়ে বিপজ্জনক শহর এখন ঢাকা। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুুলাই মাস পর্যন্ত রাজধানী জুড়ে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিহত এবং ২ হাজার ৪৮৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি ছিলেন পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৩৪ জন পুরুষ, ২১৯ জন নারী এবং ১৩১ জন শিশু রয়েছে। পথচারীরা সবচেয়ে বেশি ৫৯২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে রাতের বেলায়, যখন ৫১৯ জন মানুষ নিহত হন।দুর্ঘটনার হটস্পট যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল, বিশ্ব রোড এবং এয়ারপোর্ট রোড :প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার উচ্চ হারের কারণ হিসেবে বেশ কিছু বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, যানবাহনের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত সড়ক সক্ষমতা, ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের মিশ্র চলাচল, ফুটপাত দখল, ফুটওভার ব্রিজগুলো অনুপযুক্ত স্থানে থাকা বা ব্যবহারের অযোগ্য হওয়া এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা বা ক্লান্ত অবস্থায় দীর্ঘ সময় ড্রাইভ করাও দুর্ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ। যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল, বিশ্ব রোড এবং এয়ারপোর্ট রোডকে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান (হটস্পট) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।ঢাকার সড়কগুলো একেবারেই পথচারীবান্ধব নয় :ঢাকায় প্রয়োজনের তুলনায় সড়ক এমনিতেই কম। মোট সড়কের তুলনায় হাঁটার রাস্তা বা ফুটপাত আরো কম। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ২ হাজার কিলোমিটারের কিছু বেশি। এর বিপরীতে ফুটপাত রয়েছে মাত্র ৬০০ কিলোমিটারের মতো। আবার যে ফুটপাত রয়েছে, তার বেশির ভাগই চলাচলের অনুপযোগী। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার সড়কগুলো একেবারেই পথচারীবান্ধব নয়। বেশির ভাগ ফুটপাতও অবৈধ দখলে, যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হন পথচারীরা। আবার পথচারীদের মধ্যেও অসচেতনতা রয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সড়কে আধুনিক সংকেতব্যবস্থা না থাকায় সড়কের প্রতিটি মোড় ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় পথচারীদের। ফলে ঢাকায় দুর্ঘটনায় পথচারীদের মৃত্যু বেশি। সড়ক পার হতে গিয়ে বাসচাপায় বা অন্য কোনো যানবাহনের ধাক্কায় মৃত্যু ঢাকা শহরে প্রায়ই ঘটছে। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে সড়ক পার হওয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন নটর ডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসান। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মীম নিহত হন।
বুয়েটের গবেষণায় যা উঠে এসেছে :বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা ঢাকার সড়কে পথচারীদের মৃত্যু কেন বেশি, তার কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ বের করেছেন। তাদের মতে, প্রথমত, সড়কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে যানবাহনগুলোকে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। ফলে সিগন্যাল ছাড়লে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। পথচারীদের পারাপারে আলাদা কোনো সংকেতব্যবস্থা না থাকায় অনেকে ঐ সময় সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, যাত্রী ওঠানো নিয়ে দুই বাসের রেষারেষির সময় সড়কে দাঁড়ানো পথচারী দুর্ঘটনার শিকার হন। তৃতীয়ত, ফুটপাতগুলো পথচারী চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় অনেকে সড়কে হাঁটতে বাধ্য হন। এতেও দুর্ঘটনা ঘটছে। চতুর্থত, রাতে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন ঢাকায় বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। এটিও পথচারীদের মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছে। এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট বাহনের চলাচলের অনুমোদন বা রুট পারমিট নেই, নয়তো ফিটনেস সনদ নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সই নে২৭৬ দক্ষ চালককে সম্মানিত করা হবে :‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস-২০২৬’ উপলক্ষ্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (আরটিএইচডি) সারা দেশের ২৭৬ জন দক্ষ ও পেশাদার চালককে সম্মাননা প্রদান করবে। আগামী ২৮ অক্টোবর এই সম্মাননা প্রদান করা হবে। এর মধ্যে রাজধানীতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ২০ জন চালককে এবং প্রতিটি জেলা থেকে চার জন করে চালককে জেলা পর্যায়ে সম্মানিত করা হবে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং দক্ষ চালকদের উত্সাহিত ও দায়িত্বশীল ড্রাইভিংয়ের প্রতি অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সমিতির সুপারিশ :সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যাত্রীকল্যাণ সমিতি ১২টি সুপারিশ প্রস্তাব করে। এর মধ্যে আছে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে পরিবহন খাত সংস্কার, সড়ক নিরাপত্তা, উন্নত গণপরিবহন ও যাত্রী অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা। সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো। রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশার পরিবর্তে দেশের সব নগরীতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ইলেকট্রিক এসি বাসের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলে সরকারঘোষিত ৬০ ঘণ্টার ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা ইত্যাদি।
এক বছরের পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান ইলিয়াস কাঞ্চনের :জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে সড়ক নিরাপত্তায় এক বছরের পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার দায়িত্ব, কাজের সময়সীমা এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের পদ্ধতি স্পষ্ট করতে হবে। আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল বুধবার লন্ডন থেকে পাঠানো এক বার্তায় ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তায় নেওয়া কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রকাশ্যে মূল্যায়ন করতে হবে। কী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা দেশবাসীকে জানাতে হবে ।
















