প্রযুক্তির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি স্মার্টফোন। আজকাল অনেকেই শিশুর হাতে এ যন্ত্রটি দিয়ে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করছেন। শিশুকে খাওয়ানোর সময় এই ডিভাইস ব্যবহার করা হয় বেশি। একসময় শিশুর মধ্যে এমন অভ্যাস তৈরি হয়, এটা ছাড়া শিশুকে খাওয়ানোই সম্ভব হয় না।
এতে কারো কারো স্ক্রিন ডিপেনডেন্সি ডিস-অর্ডারও হতে পারে। এর ফলে দেখা দেয় বেশ কিছু শারীরিক সমস্যা—ঘুমের অসুবিধা, পিঠ ও কোমর ব্যথা, মাথা ব্যথা, চোখের জ্যোতি কমে যাওয়া, ওজন বেড়ে যাওয়া, পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি। কারো কারো মধ্যে ইমোশনাল উপসর্গ, যেমন—উদ্বিগ্নতা, অসততা, একাকিত্ব, দোষী বোধ ইত্যাদিও হতে পারে। শিশুর বাইরে যাওয়ার প্রবণতাও কমে যায়।
স্মার্টফোন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা। অথচ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের উপযুক্ত সময় এটি। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ হলো শিশুর ক্রমে ক্রমে এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কথা বলতে শেখা, হাঁটাচলা শেখা এবং স্বাভাবিক বুদ্ধির বিকাশ হওয়া। আর এই সময় শিশুর একদিকে দীর্ঘ সময়ে মোবাইল গেম খেলা, ইউটিউব দেখা, অন্যদিকে স্বাভাবিক উদ্দীপনামূলক খেলাধুলা না করায় শিশুর স্নায়বিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ নির্ভর করে পরিবেশ ও অন্যান্য শিশুর সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদানের ওপর। বলা হয়, শিশু শেখে দেখতে দেখতে এবং অন্যদের সঙ্গে খেলতে খেলতে।
অধিক সময় শিশু মাল্টিমিডিয়ার সংস্পর্শে থাকায় মা-বাবার সঙ্গে তার সামাজিক যোগাযোগ এবং সমবয়সী শিশুর সঙ্গে খেলাধুলা ও মেলামেশা একেবারেই কমে যায়। শিশুর বিকাশের প্রারম্ভে অত্যধিক মোবাইল ফোনের ব্যবহার শিশুর মস্তিষ্কের গঠন প্রকৃতির ভিন্নতা বদলে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন গবেষকরা।
শিশুদের ইলেকট্রনিক মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে নিম্নরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস ও টেলিভিশন কমিটি—
♦ দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সের শিশুরা সারা দিনে দু-এক ঘণ্টা স্ক্রিন দেখতে পারবে, কিন্তু মানসম্মত প্রোগ্রাম হতে হবে।
♦ দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দিতে একেবারেই নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
♦ শিশুদের বেডরুমে টেলিভিশন না রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
♦ শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে কিছু উদ্দীপনাকে উৎসাহিত করেছে তারা, যেমন—শিশুর সঙ্গে অভিভাবকের কথা বলা, গল্প করা, ছড়া বলা, গান করা ইত্যাদি।
অভিভাবকের করণীয়
♦ মা-বাবার সচেতনতাই শিশুর মোবাইল ফোন ব্যবহার কমাতে পারে।
♦ মোবাইল ফোন বাদ দিয়ে শিশুদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে।
♦ সৃজনশীল কাজ যেমন—ছবি আঁকা, গল্প করা, গান করা, পাজল খেলা, লুডু খেলা ইত্যাদিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
♦ সম্ভব হলে এসব খেলায় মা-বাবার অংশগ্রহণও শিশুর মোবাইল ফোন ব্যবহার কমাতে পারে।
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান
শিশু নিউরোলজি বিভাগ, বিএসএমএমইউ
















