বর্তমান বিশ্বে অকাল জন্ম একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান দেখায়, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় দেড় লাখ শিশুর অকাল জন্ম হয়। আর এটিই নবজাতক মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। এর ফলে শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
অকাল জন্ম কী
গর্ভধারণের ৩৭ সপ্তাহের আগে যদি শিশুর জন্ম হয়, তবে সেটিকে অকাল জন্ম হিসেবে ধরা হয়। স্বাভাবিক গর্ভাবস্থায় খুব বেশি জটিলতা ছাড়াই জন্ম দিতে ৪০ সপ্তাহ সময় লাগে। তবে ৩৭ সপ্তাহের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের অসম্পূর্ণ অঙ্গ বিকাশের কারণে তারা বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। যত তাড়াতাড়ি শিশু জন্মগ্রহণ করে, তত বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
অকাল জন্মের প্রধান লক্ষণ
৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ অকাল জন্মের ইঙ্গিত দিতে পারে। সে লক্ষণগুলো সম্পর্কে গর্ভবতী নারীদের সচেতন থাকা উচিত। সেই সঙ্গে লক্ষণগুলো দেখা দিলে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
৪-৬ ঘণ্টার ব্যবধানে নিয়মিত সংকোচন।
ব্যথা না হলেও এগুলো উপেক্ষা করবেন না।
কম তীব্রতার সঙ্গে পিঠে অবিরাম ব্যথা।
পেলভিক চাপ অনুভব করা, যেন শিশুটি ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
যোনিপথ থেকে রক্তাক্ত শ্লেষ্মার মতো স্রাব
যোনি থেকে রক্তপাত
যোনি থেকে তরল পদার্থ বের হওয়া
কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই ডায়রিয়া বা পেটের সমস্যা
লক্ষণগুলো হালকা হলেও অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অকাল জন্মের জটিলতা প্রতিরোধ করতে পারে।
অকাল জন্মের পেছনের কারণ
অকাল জন্মের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে এবং প্রায়শই সঠিক কারণটি অজানা থাকে। তবে কিছু সাধারণ অবস্থা অকাল জন্মের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
সংক্রমণ : কিছু সংক্রমণ, যেমন ইউটিআই (মূত্রনালির সংক্রমণ) বা এসটিআই (যৌন সংক্রমণ) অকাল প্রসবের কারণ হতে পারে।
একাধিক গর্ভধারণ : একাধিক শিশু গর্ভধারণ করলে অকাল জন্মের সম্ভাবনা থাকে।
পূর্ববর্তী ঘটনা : আগে কখনো অকাল জন্ম হলে আবারও সেই ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
প্ল্যাসেন্টার জটিলতা : প্ল্যাসেন্টার জটিল অবস্থা, যেখানে এটি জরায়ু থেকে আলাদা হয়ে যায় (প্লাসেন্টাল অ্যাব্রাপশন) বা জরায়ুমুখ ঢেকে ফেলে (প্লাসেন্টা প্রেভিয়া), অকাল প্রসবের কারণ হতে পারে।
বয়স : গর্ভাবস্থায় খুব কম বয়সী বা বৃদ্ধ হওয়ার কারণেও (১৭ বছরের কম বা ৩৫ বছরের বেশি) অকাল জন্ম হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বয়স্ক মায়েদের তুলনায় অল্পবয়সী মায়েদের বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
অতিরিক্ত পরিশ্রম : গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, বিশেষ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ত্রৈমাসিকের মধ্যে, অকাল জন্মের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
আপনার যদি অকাল জন্মের বিষয়ে উদ্বেগ থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে কথা বলা উচিত এবং যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
রোগ নির্ণয়
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক ঝুঁকির কারণগুলো বুঝতে আপনার চিকিৎসা ইতিহাস ও জীবনধারা জানতে চাইবেন। তারা আপনার সম্মুখীন হওয়া লক্ষণ ও উপসর্গগুলোও মূল্যায়ন করবেন। আপনার অবস্থা সম্পর্কে গভীরভাবে বোঝার জন্য চিকিৎসকরা নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করতে পারেন।
প্রস্রাব পরীক্ষা : ডাক্তাররা প্রায়শই কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করার জন্য প্রস্রাব পরীক্ষার পরামর্শ দেন।
জরায়ু পর্যবেক্ষণ : এটি সাধারণত আপনার সংকোচনের সময়কাল এবং সময় পরীক্ষা করার জন্য করা হয়।
আল্ট্রাসাউন্ড : এটি একটি খুবই সাধারণ পরীক্ষা, যা গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকরা প্রায়শই করেন। এটি তাদের শিশুর অবস্থান এবং তরলের পরিমাণ বুঝতে সাহায্য করে।
অকাল জন্মের জটিলতা
অকাল জন্ম শিশুর পাশাপাশি মায়ের জন্যও বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। কিছু স্বল্পমেয়াদি জটিলতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে—
শ্বাসকষ্টের সমস্যা
হৃৎপিণ্ডজনিত সমস্যা
ইন্ট্রাভেন্ট্রিকুলার রক্তক্ষরণ
নিম্ন শরীরের তাপমাত্রা
হজম সমস্যা
দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
কিছু দীর্ঘমেয়াদি জটিলতাও রয়েছে, যা শিশুর সুস্থ বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে—
সেরিব্রাল পলসি
উন্নয়নমূলক বিলম্ব
বক্তৃতা সমস্যা
এডিএইচডি-এর মতো আচরণগত চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের সমস্যা
প্রতিরোধ
অকাল জন্ম প্রতিরোধ করা প্রায়শই সম্ভব। জীবনযাত্রার পরিবর্তনগুলো এই সম্ভাবনা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই জীবনযাপনে আনতে হবে যেসব পরিবর্তন—
স্বাস্থ্যকর ওজন : অতিরিক্ত ওজন বা কম ওজন প্রায়শই অকাল জন্মের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হালকা ব্যায়াম ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
ক্ষতিকারক অভ্যাস : নিরাপদ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করতে গর্ভাবস্থায় ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ করুন।
মানসিক চাপ : মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা অকাল জন্মের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন এবং আপনার মানসিক চাপ ও অন্যান্য সম্পর্কিত সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
সংক্রমণ প্রতিরোধ : গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ভালো স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন করুন। ঘন ঘন হাত ধুয়ে নিন এবং নিশ্চিত করুন যে আপনার টয়লেট সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসা সহায়তা নিন
নিয়মিত বিরতিতে বেদনাদায়ক সংকোচন
শিশুর নড়াচড়ার অভাব
প্রস্রাব রক্ত
যান্ত্রিক রক্তপাত
যোনি থেকে ক্রমাগত তরল বের হওয়া
















